জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব ধীরে ধীরে দেশের নিত্যপণ্যের বাজারে পড়তে শুরু করেছে। এরই মধ্যে চালের পাইকারি বাজারে বাড়তি খরচ যুক্ত হয়েছে। পরিবহন ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় বস্তাপ্রতি চালের দাম ২৫ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসায়ীদের মতে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়েছে। এর প্রভাব শুধু চাল নয়, ধীরে ধীরে অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের বাজারেও পড়তে পারে। তবে ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির অজুহাতে যাতে ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত দাম না বাড়াতে পারেন, সে জন্য বাজার তদারকি আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ও চাক্তাইয়ের পাইকারি চালের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে বাজারে চালের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। নওগাঁ, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা চাল আড়তে উঠছে এবং শ্রমিকরা তা গুদামে সাজিয়ে রাখছেন। ক্রেতাদের উপস্থিতিও স্বাভাবিক রয়েছে।
তবে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, মূল সমস্যা তৈরি হয়েছে পরিবহন ব্যয়ে। জ্বালানির দাম বাড়ার পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে চাল আনার ট্রাক ভাড়া বেড়ে গেছে।
ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, দিনাজপুর থেকে চট্টগ্রামে চাল আনতে আগে ট্রাক ভাড়া ছিল ২৬ হাজার টাকা। বর্তমানে একই দূরত্বের জন্য প্রায় ৩৩ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে। নওগাঁ থেকে চাল পরিবহনের ভাড়া ২২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ২৯ হাজার টাকা হয়েছে। বগুড়া থেকে চাল আনতে আগে যেখানে ১৮ হাজার টাকা লাগত, এখন সেখানে ২৩ থেকে ২৪ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে।
এই বাড়তি পরিবহন ব্যয়ের কারণে প্রতি বস্তা চালের দাম ২৫ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
পাহাড়তলী বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. রেজা খান বলেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে দূরত্ব অনুযায়ী প্রতিটি ট্রাকে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি খরচ হচ্ছে। এর প্রভাব চালসহ সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের বাজারে পড়বে।
চাক্তাই চাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওমর আজম বলেন, বর্তমানে ধানের দাম কিছুটা কমতির দিকে রয়েছে। তবে পরিবহন খরচ বেড়েছে। ভবিষ্যতে ধানের দাম বাড়লে চালের বাজার আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে।
চালের বাজারের পাশাপাশি সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যেও বাড়ছে উদ্বেগ। পাহাড়তলী বাজারের এক ক্রেতা বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ আরও বেড়ে যাচ্ছে। সীমিত আয়ের মানুষদের জন্য এখন সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
পরিবহন খাতের ব্যবসায়ীরাও বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পণ্য পরিবহন খরচ বাড়া স্বাভাবিক। বাংলাদেশ কভার্ডভ্যান-ট্রাক-প্রাইম মুভার পণ্য পরিবহন মালিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব চৌধুরী জাফর আহমদ বলেন, পরিবহন খাতের পরিচালন ব্যয়ের বড় অংশই জ্বালানির সঙ্গে সম্পর্কিত।
তার মতে, জ্বালানি ব্যয় বাড়লে পণ্যের উৎপাদন, পরিবহন এবং বাজারজাতকরণের খরচ বাড়ে। শেষ পর্যন্ত এই বাড়তি চাপ ভোক্তার ওপর গিয়ে পড়ে। তিনি পরিবহন খাতের ব্যয় বিবেচনা করে যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণের জন্য সরকারের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা জানান।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবও বাজার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। ক্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, অনেক ব্যবসায়ী জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির অজুহাতে আগের কেনা পণ্যও বেশি দামে বিক্রির চেষ্টা করেন।
তিনি বলেন, দেশে একবার কোনো পণ্যের দাম বেড়ে গেলে তা আবার কমতে চায় না। তাই বাজারে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। ব্যবসায়ীরা কখন পণ্য কিনেছেন, কত দামে কিনেছেন এবং কত দামে বিক্রি করছেন—এসব বিষয় যাচাই করা দরকার।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকেও বাজার পর্যবেক্ষণের কথা জানানো হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক ফয়েজ উল্যাহ বলেন, নিয়মিত বাজার অভিযান চলছে এবং অনিয়ম পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তবে সব পণ্যের বাজারে একই ধরনের প্রভাব দেখা যায়নি। চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে দেশি পেঁয়াজ, চায়না আদা ও রসুনের দাম এখনো বাড়েনি বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবহন ভাড়া বাড়লেও বিক্রি কম থাকায় এবং এসব পণ্য দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকায় তারা দাম বাড়াতে পারছেন না। বর্তমানে দেশি পেঁয়াজ প্রতি কেজি ৩০ টাকা, চায়না আদা ৯৩ টাকা এবং চায়না রসুন ১২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু স্থল পরিবহনেই সীমাবদ্ধ নেই। চট্টগ্রামের বন্দর ও আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমেও বাড়তি খরচ যুক্ত হচ্ছে।
সরকার ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করেছে। এর পর বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলোর বিভিন্ন সেবায় ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ জ্বালানি সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোস অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, ডিজেলনির্ভর যন্ত্রপাতি ও পরিবহন কার্যক্রমের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে এই অতিরিক্ত সারচার্জ নেওয়া হচ্ছে। নতুন এই মাশুল খালি কনটেইনার পরিবহন, কনটেইনার ওঠানো-নামানো, রপ্তানি পণ্য ব্যবস্থাপনা, ওজন পরিমাপ এবং আমদানি পণ্য খালাসসহ বিভিন্ন সেবায় প্রযোজ্য হবে।
এ ছাড়া লাইটার জাহাজের ভাড়াও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণে নৌপরিবহন খরচও বাড়বে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি হলে এর প্রভাব অর্থনীতির প্রায় সব খাতেই পড়ে। কারণ উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহন পর্যন্ত সব কার্যক্রমই জ্বালানির সঙ্গে যুক্ত।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে সরকার হয়তো দাম সমন্বয় করেছে, তবে এর প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর যাতে কম পড়ে, সে জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হবে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর চালের বাজারে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা এখনো মূলত পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির মধ্যেই সীমিত রয়েছে। তবে বাজারে নজরদারি না থাকলে এই সুযোগে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাই সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

