বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে অপ্রচলিত বাজারগুলোতে। দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রচলিত বাজারের ওপর নির্ভরশীল থাকলেও এখন জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, রাশিয়া, মেক্সিকোসহ নতুন বাজারগুলোতে বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদা বাড়ছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আগস্ট মাসে অপ্রচলিত বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি রেকর্ড ৬৪২ দশমিক ৯৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। এক মাসের হিসাবে এই বাজারগুলোতে এটিই এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ রপ্তানি আয়।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট মাসে অপ্রচলিত বাজারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পোশাক রপ্তানি হয়েছে জাপানে। দেশটিতে বাংলাদেশ থেকে ১১৮ দশমিক ৬৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে।
এরপর অস্ট্রেলিয়ায় ৭৫ দশমিক ১৪ মিলিয়ন, ভারতে ৭২ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন, তুরস্কে ৫৯ দশমিক ৫৭ মিলিয়ন এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ৪৫ দশমিক ১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে।
এ ছাড়া মেক্সিকোতে ৩২ দশমিক ৯৭ মিলিয়ন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২৮ দশমিক ৬২ মিলিয়ন, ব্রাজিলে ২৪ দশমিক ২৪ মিলিয়ন, চীনে ২০ দশমিক ৭০ মিলিয়ন এবং সৌদি আরবে ১৯ দশমিক ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে।
অন্যান্য অপ্রচলিত বাজারেও বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদা বাড়ছে। মালয়েশিয়ায় ১৫ দশমিক ৯৮ মিলিয়ন, চিলিতে ১৩ দশমিক ১৫ মিলিয়ন, দক্ষিণ আফ্রিকায় ১৩ দশমিক ১০ মিলিয়ন, রাশিয়ায় ৯ দশমিক ৭৯ মিলিয়ন এবং নিউজিল্যান্ডে ৮ দশমিক ৬১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে।
এ ছাড়া অন্যান্য অপ্রচলিত বাজারে আরও ৮৫ দশমিক ২১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে।
ইপিবির তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অপ্রচলিত বাজারে প্রতি মাসে গড়ে ৫৭৪ দশমিক ৩৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছিল। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে এই গড় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬১১ দশমিক ৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে।
শুধু রপ্তানির পরিমাণ নয়, মোট পোশাক রপ্তানিতে অপ্রচলিত বাজারের অংশও বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির ১৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ এসেছিল এসব বাজার থেকে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দিকে এই অংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ৩২ শতাংশে।
আগস্ট মাসে বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৬০৮ দশমিক ৮৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে অপ্রচলিত বাজারগুলোতে রপ্তানি হয়েছে ৬৪২ দশমিক ৯৩ মিলিয়ন ডলারের পোশাক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত মূলত ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারনির্ভর ছিল। তবে বৈশ্বিক বাজারের পরিবর্তন, ক্রেতাদের চাহিদার বৈচিত্র্য এবং নতুন বাজারের সুযোগ কাজে লাগানোর কারণে অপ্রচলিত বাজার এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, অপ্রচলিত বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি সম্প্রসারণের বড় সুযোগ রয়েছে। এতদিন এসব বাজারে তুলনামূলক কম গুরুত্ব দেওয়া হলেও এখন কৌশলগতভাবে এগুলোকে কাজে লাগানোর সময় এসেছে।
তিনি বলেন, অপ্রচলিত বাজার শুধু উচ্চমূল্যের পোশাকের জন্য সীমাবদ্ধ নয়। এসব দেশে বিভিন্ন ধরনের তৈরি পোশাকের বড় চাহিদা রয়েছে। ফলে প্রচলিত বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নতুন বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে রপ্তানি আরও বাড়ানো সম্ভব।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎসগুলোর একটি। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার পাশাপাশি নতুন ক্রেতা ও নতুন অঞ্চল খুঁজে বের করা এখন এই খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদা বৃদ্ধিকে তাই শুধু রপ্তানি আয়ের বৃদ্ধি হিসেবে নয়, বরং বাজার বৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
আগামী দিনে অপ্রচলিত বাজারে আরও বিনিয়োগ, ব্র্যান্ডিং, বাজার গবেষণা এবং ক্রেতাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি করা গেলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত বৈশ্বিক বাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে।

