প্রায় সাত মাস ধরে চলমান ইরান-সংশ্লিষ্ট যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা শুরু হয়েছিল সেই শুরু থেকেই, আর এখন নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে বাব আল-মান্দেব প্রণালিও। বিশ্বের প্রায় পঁয়ত্রিশ শতাংশ তেল সরবরাহ যেসব পথ দিয়ে যায়, তার একটি বড় অংশেই এই বাধা তৈরি হলেও বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি।
বাস্তবতাকে মাথায় রেখে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ধীরে ধীরে বিকল্প পথে এগোচ্ছে এবং নানা ক্ষেত্রে চাহিদা কমিয়ে হরমুজ-নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে। এই পরিবর্তনের কারণেই আগের তুলনায় কম আমদানির পরও দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি সচল থাকতে পেরেছে, যদিও এর উৎপাদন কাঠামোয় বড় পরিবর্তন এসেছে।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ, এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার বাজারে যাওয়া মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় পনেরো শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, যার দৈনিক পরিমাণ প্রায় দুই কোটি ব্যারেল। এই জ্বালানির প্রায় নব্বই শতাংশই যায় বাংলাদেশসহ এশিয়ার বাজারে। অন্যদিকে বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে যায় বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় এক-দশমাংশ, যা এডেন উপসাগর ও লোহিত সাগরকে যুক্ত করে সুয়েজ খালের দিকের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ।
একটি শীর্ষ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যাংকের পণ্যবাজার বিশ্লেষক সম্প্রতি এক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, মূলত তিনটি কারণে তেলের বাজার প্রাথমিক আশঙ্কার তুলনায় কম বেড়েছে। তার হিসাবে, যুদ্ধ শুরুর পরপরই তেলের দাম দেড়শ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার শঙ্কা ছিল, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলেও দাম সেই পর্যায়ে পৌঁছাবে না। তার সাম্প্রতিক একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল পরিবহনের বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে—হুতিদের হাতে একটি বিকল্প পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগে সৌদি আরব একটি পাইপলাইনের মাধ্যমে দৈনিক কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল ইরানের প্রভাবমুক্ত বন্দরগুলোতে পাঠিয়েছে।
এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, ভেনেজুয়েলা, ব্রাজিল, গায়ানা ও কানাডা একযোগে দৈনিক প্রায় বিশ লাখ ব্যারেল উৎপাদন বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশ তাদের জ্বালানি চাহিদা আগের তুলনায় কমিয়ে দিয়েছে, এবং যুক্তরাষ্ট্র ও চীন ছাড়া অধিকাংশ দেশ প্রত্যাশার তুলনায় কম তেল ব্যবহার করেছে নিজেদের মজুত থেকে। এসব কারণে যুদ্ধ চলাকালে বিশ্বব্যাপী তেলের চাহিদা দৈনিক প্রায় পঞ্চাশ লাখ ব্যারেল কমে গেছে। ভ্রমণ কমে যাওয়া, গণপরিবহন ও বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বৃদ্ধি যেমন এই চাহিদা কমাতে ভূমিকা রেখেছে, তেমনি অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের বাড়ি থেকে কাজের ব্যবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তও একটি কারণ।
সরবরাহ পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ায় স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বিশ্বে দৈনিক প্রায় সোয়া এক কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ কমেছে, আর একই সময়ে চাহিদাও কমেছে প্রায় পঞ্চাশ লাখ ব্যারেল—এই দুই দিকের ভারসাম্যই বাজারকে বড় ধাক্কা থেকে রক্ষা করেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে দেশে বছরে ছেষট্টি থেকে আটষট্টি লাখ টনের মতো জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়, যার একটি বড় অংশ ডিজেল ও অপরিশোধিত তেল। এর মধ্যে প্রায় পনেরো লাখ টন অপরিশোধিত তেল আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, যা ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধিত হয়ে ষোলো ধরনের তেলজাতীয় পণ্যে রূপান্তরিত হয়। আগে এই শোধনাগারে দৈনিক গড়ে সাড়ে চার হাজার টন জ্বালানি পণ্য উৎপাদিত হলেও এখন তা নেমে এসেছে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টনে, আর উৎপাদিত পণ্যের ধরনও ষোলো থেকে কমে আট থেকে দশে নেমেছে। এতদিন কারখানাটি কেবল সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করলেও যুদ্ধ শুরুর পর বিকল্প উৎস হিসেবে মালয়েশিয়ার অপরিশোধিত তেল ব্যবহারের কথাও ভাবা হচ্ছে।
সৌদি অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ সংকটে চলতি বছরের এপ্রিলে কিছুদিনের জন্য পরিশোধন কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিল ইস্টার্ন রিফাইনারি, তবে সেই সময়টাতেই কারখানার সংস্কার-সংক্রান্ত বিকল্প কাজ সম্পন্ন করে নেয় দেশের এই একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত শোধনাগার এবং তখন থেকেই উৎপাদন কমিয়ে রাখা হয়েছে। এলএনজি ও এলপিজির সরবরাহেও সম্প্রতি কারিগরি ত্রুটির কারণে কয়েকদিন সমস্যা দেখা গেলেও তাতে বড় ধরনের মজুত সংকট তৈরি হয়নি, কারণ তুলনামূলক বেশি দাম দিয়ে হলেও বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহ চালু রাখা সম্ভব হয়েছে।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত জ্বালানি নিয়ে বাংলাদেশের দুশ্চিন্তার কারণ নেই, কারণ তেল ও গ্যাস সংগ্রহে বিভিন্ন বিকল্প উৎসের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।
একটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা সম্প্রতি এক সংবাদমাধ্যমে বলেন, তেলের দাম আর আগের মতো ঊর্ধ্বমুখী থাকবে না এবং নিকট ভবিষ্যতে দেড়শ ডলারের ঘরে পৌঁছানোর সম্ভাবনা কম। বাস্তবেও এমন ইঙ্গিত মিলছে—বাব আল-মান্দেব প্রণালি হুতিদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পরও গত সোমবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের নভেম্বরের ফিউচার মূল্য সেদিন প্রায় দুই শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি একশ এক ডলারের কিছু বেশিতে নেমে আসে, যেখানে মাত্র কয়েকদিন আগে অর্থাৎ ১৫ সেপ্টেম্বর তা একশ নয় ডলার ছুঁয়েছিল। চলতি বছরের শেষ ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা শুরু করার পর ৩০ এপ্রিল তেলের দাম সর্বোচ্চ একশ ছাব্বিশ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল, তবে তারপর থেকে ওঠানামা করলেও তা আর সেই সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম করেনি।
বিশ্লেষকদের সামগ্রিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিকল্প উৎপাদন উৎস, বিকল্প পরিবহন পথ এবং বিশ্বব্যাপী চাহিদা সংকোচন—এই তিনের সমন্বয়েই একটি সম্ভাব্য বড় জ্বালানি সংকট এখন পর্যন্ত ঠেকানো সম্ভব হয়েছে, যদিও দাম বৃদ্ধির প্রভাব থেকে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতি পুরোপুরি মুক্ত থাকতে পারেনি।

