পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে সহযোগিতা বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে স্থানীয় সময় শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) এই চুক্তি সই হয়। বাংলাদেশের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসাদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জ্বালানি ও পরিবেশ বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেকব হেলবার্গ সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) বিএনপি মিডিয়া সেল এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়। এই চুক্তির মধ্য দিয়ে পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো।
এই চুক্তির পটভূমি বেশ পুরোনো। ১৯৮১ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা শুরু হয়। এরপর ১৯৯৩ সালে সেই চুক্তি নবায়ন করা হয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে সেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে একটি সমঝোতা স্মারকের প্রস্তাব দেয়। গত আগস্ট মাসে মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোরের ঢাকা সফরের সময় এই প্রস্তাব দেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে হলে সেটি বিবেচনা করা হবে।’ সেই প্রক্রিয়ারই চূড়ান্ত রূপ হলো এই সমঝোতা স্মারক।
সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, দুই দেশ পারমাণবিক শক্তি, নিরাপত্তা, সুরক্ষা এবং অপ্রসারণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াবে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, সব পারমাণবিক সহযোগিতা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সর্বোচ্চ নিরাপত্তা মান, সুরক্ষা ও অপ্রসারণ নীতি মেনে পরিচালিত হবে। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই পারমাণবিক অস্ত্র অপ্রসারণ চুক্তির (এনপিটি) সদস্য এবং উভয়েরই আইএইএ সুরক্ষা চুক্তি ও অতিরিক্ত প্রোটোকল বলবৎ রয়েছে। এর আগে গত মে মাসে দুই দেশ জ্বালানি খাতে কৌশলগত সহযোগিতা বিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছিল। নতুন এই চুক্তিটি মূলত পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে কেন্দ্রীভূত। আন্তর্জাতিকভাবে এই ধরনের চুক্তি ‘১২৩ চুক্তি’ নামে পরিচিত, যা মার্কিন পরমাণু শক্তি আইনের ১২৩ ধারা অনুসারে স্বাক্ষরিত হয়।
এই চুক্তির সবচেয়ে বড় প্রাসঙ্গিকতা হলো বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর প্রকল্প। রাশিয়ার রোসাটমের সহায়তায় পাবনার ঈশ্বরদীতে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এই কেন্দ্রটি নির্মিত হচ্ছে। এরই মধ্যে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটে জ্বালানি সরবরাহ করা হয়েছে। তবে দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহ নির্ধারিত সময়ে পৌঁছায়নি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শেখ মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, ‘আমরা বিমানবন্দরে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলাম, কিন্তু রোসাটমের লিয়াজোঁ কর্মকর্তা জানিয়েছেন আকাশসীমা পরিষ্কার না থাকায় জ্বালানি পাঠানো সম্ভব হয়নি।’ কোন দেশ আকাশসীমা বন্ধ রেখেছে তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন সমঝোতা স্মারক বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশলে একটি বাড়তি স্তর যোগ করল। দেশটি দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্যময় করতে চাইছে, যাতে কোনো একক উৎসের ওপর নির্ভরতা কমে।
এই চুক্তিকে শুধু জ্বালানি সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে ভুল হবে। এটি ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। রূপপুর প্রকল্প রাশিয়ার সহায়তায় নির্মিত হচ্ছে, আবার একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতা বাড়ছে। বাংলাদেশ এই দুই পরাশক্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে নিজের স্বার্থ আদায়ের কৌশল নিচ্ছে। এর আগে গত আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূতের সফরে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (এআরটি) বাস্তবায়নের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। ওই সময় ভিসা বন্ডের মতো বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছিল। সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক, জ্বালানি ও কূটনৈতিক স্বার্থকে একসূত্রে গেঁথে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিতে চাইছে।
সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা সহজ, কিন্তু এর বাস্তবায়নই আসল চ্যালেঞ্জ। পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে সহযোগিতা বাড়াতে হলে প্রয়োজন হবে প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষ জনবল তৈরি, আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলা। বাংলাদেশের জন্য সুযোগ হলো, রূপপুর প্রকল্পের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার জ্ঞান অর্জন করা। তবে চ্যালেঞ্জ হলো, ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা, যাতে কোনো এক পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক অন্য পক্ষের সঙ্গে ক্ষতিকর প্রভাব না ফেলে। এখন দেখার বিষয়, এই চুক্তি কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয় এবং বাংলাদেশ কতটা সুফল পায়।

