চীনের সঙ্গে বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এবং দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে যৌথ উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ও চীন। এ লক্ষ্যে দুই দেশ একটি জয়েন্ট অ্যাকশন প্ল্যান (জেএপি) বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছে।
এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বাড়ানো, চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এবং দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ককে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করা।
২০২৫ সালে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে। চীনে বাংলাদেশের রপ্তানির তুলনায় আমদানির পরিমাণ অনেক বেশি হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে এই ঘাটতি বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও চীনের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে এই পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২৫ জুন বেইজিং সফরের সময় এই উদ্যোগের সূচনা হয়।
জয়েন্ট রিসার্চ টিম ইতোমধ্যে গঠন করা হয়েছে। বাংলাদেশের ২৩ সদস্যের একটি দল চীনা প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছে এবং চূড়ান্ত প্রতিবেদনের আগে বিভিন্ন উপকমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য শুধু বাণিজ্য বৃদ্ধি নয়, বরং বাংলাদেশি পণ্যের জন্য চীনের বড় বাজারে কার্যকর প্রবেশাধিকার তৈরি করা।
বাংলাদেশ চায় চীনা বাজারে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, কৃষিপণ্য, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত পণ্য, সিরামিক, সামুদ্রিক পণ্য, চামড়া ও হস্তশিল্পের মতো খাতগুলোতে রপ্তানি বাড়াতে।
বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিসিসিসিআই) মনে করছে, উদ্যোগটি সফল করতে হলে শুধু আলোচনা নয়, বাস্তব বাণিজ্য সুযোগ তৈরি করতে হবে। তাদের মতে, বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক পণ্য নির্বাচন, বাজার প্রবেশের বাধা দূর করা এবং বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের সঙ্গে চীনা ক্রেতাদের সরাসরি যোগাযোগ তৈরি করা জরুরি।
ওষুধ খাতেও বড় সম্ভাবনা দেখছে ব্যবসায়ী সংগঠনটি। বিশেষ করে ক্যানসারের ওষুধ ও ওজন নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত পণ্যের ক্ষেত্রে চীনের বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে।
তবে বাংলাদেশি পণ্যের চীনা বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে ‘রুলস অব অরিজিন’ বা উৎপত্তি সংক্রান্ত শর্ত। চীনের শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতে অনেক পণ্যকে নির্দিষ্ট মাত্রার স্থানীয় মূল্য সংযোজন দেখাতে হয়, যা বাংলাদেশের অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে পূরণ করা কঠিন।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, চীন বাংলাদেশি হাজারো পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধা দিলেও বাস্তবে রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। তার মতে, ভবিষ্যতে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির মাধ্যমে রপ্তানির সুযোগ আরও বাড়ানো যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের পর বর্তমান সুবিধা পরিবর্তিত হতে পারে। তাই ভবিষ্যতের জন্য বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো খাতেও দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতেও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিজিএমইএ পরিচালক মোহাম্মদ সোহেল বলেন, বাংলাদেশ এখনো মূলত টি-শার্ট ও ট্রাউজারের মতো মৌলিক পোশাক রপ্তানি করে। চীনের বাজারে এই ধরনের পণ্যে প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে উঠেছে।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি লক্ষ্য থাকলেও শুধু রপ্তানির পরিমাণ বাড়ানো যথেষ্ট নয়। পণ্যে স্থানীয় মূল্য সংযোজন বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্পর্কের বর্তমান চিত্রে বড় ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। ২০২৫ সালে দুই দেশের মোট বাণিজ্য ছিল ২৪ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল মাত্র ১ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার, আর আমদানি ছিল ২২ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশের চীন থেকে আমদানির প্রধান পণ্য হলো বস্ত্র, যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক, ধাতু ও যানবাহন। অন্যদিকে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি মূলত পোশাক, মাছ, চামড়া, জুতা ও কৃষিপণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও চীনের ভূমিকা বাড়ানোর চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। ২০০০ সাল থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলার। এর বড় অংশ গেছে বিদ্যুৎ, পোশাক ও অন্যান্য খাতে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চীনের নিজস্ব উৎপাদন কাঠামোর পরিবর্তন এবং নতুন বিনিয়োগ গন্তব্য খোঁজার কারণে বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি, লজিস্টিকস, কৃষি ও ম্যান-মেইড ফাইবার পোশাক খাতে চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ পেতে পারে।
চীনের পক্ষ থেকেও বাংলাদেশকে আঞ্চলিক উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে সহযোগিতার আগ্রহ দেখানো হয়েছে। বৈদ্যুতিক যান, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পর্যটন, তথ্যপ্রযুক্তি ও লজিস্টিকস খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
তবে এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে শুধু নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর নয়, বরং বাস্তব বাজার সংযোগ, দক্ষ রপ্তানিকারক তৈরি, উন্নত সরবরাহ ব্যবস্থা এবং স্থানীয় শিল্প সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর।
বাংলাদেশ যদি চীনের বিশাল বাজারে উচ্চমূল্যের ও বৈচিত্র্যময় পণ্য নিয়ে প্রবেশ করতে পারে, তাহলে দীর্ঘদিনের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে।

