বাংলাদেশের স্থানীয় মোবাইল হ্যান্ডসেট শিল্প বর্তমানে একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। স্মার্টফোন তৈরির গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের দাম বৃদ্ধি, অবৈধ আমদানির প্রতিযোগিতা, কারখানার কম উৎপাদন সক্ষমতা এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে চাপের মধ্যে রয়েছে দেশের এই সম্ভাবনাময় খাত।
বিশেষ করে র্যাম ও রমের মতো মেমোরি উপাদানের দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় মোবাইল নির্মাতাদের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে কম দামের স্মার্টফোন বাজারে, যেখানে সাধারণ ভোক্তারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হতে পারেন।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণের কারণে বিশ্বব্যাপী মেমোরি চিপের চাহিদা বেড়েছে। ফলে স্মার্টফোন উৎপাদনে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের সরবরাহ সংকুচিত হয়ে দাম বেড়েছে।
শাওমি টেকনোলজিস বাংলাদেশের কান্ট্রি জেনারেল ম্যানেজার জিয়াউদ্দিন চৌধুরী বলেন, মেমোরি চিপের দাম বৃদ্ধি বাজেট স্মার্টফোন বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে।
গার্টনারের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ডিআরএএম ও সলিড স্টেট ড্রাইভের দাম ২০২৫ সালের তুলনায় ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর ফলে স্মার্টফোনের দাম প্রায় ১৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আইস্মার্টু টেকনোলজি বিডি লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী রেজওয়ানুল হক জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মেমোরি উপাদানের দাম প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়েছে এবং আগামী কয়েক মাসে আরও বাড়তে পারে।
যন্ত্রাংশের বাড়তি খরচের পাশাপাশি স্থানীয় উৎপাদনেও দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশে স্মার্টফোন উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় ৯ দশমিক ৯ শতাংশ কমে ৫৩ লাখ ৭৬ হাজার ইউনিটে নেমে এসেছে।
একই সময়ে ফিচার ফোন উৎপাদনও কমেছে প্রায় ৯ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৫ সালে দেশে মোট হ্যান্ডসেট উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ২ কোটি ৪৪ লাখ ইউনিট, যেখানে ২০২৪ সালে উৎপাদনের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ কোটি ৭৩ লাখ ইউনিট।
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, অনেক কারখানা এখন পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন লাইনের অর্ধেকেরও কম ব্যবহার করছে। একটি প্রতিষ্ঠানের ১০টির বেশি উৎপাদন লাইন থাকলেও বর্তমানে অর্ধেক লাইন বন্ধ রয়েছে।
দেশীয় মোবাইল শিল্পের আরেকটি বড় সমস্যা হলো গ্রে মার্কেট বা অবৈধ আমদানি। শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, দেশের মোট হ্যান্ডসেট বিক্রির ৬০ শতাংশের বেশি এখন গ্রে মার্কেটের মাধ্যমে হচ্ছে।
এর ফলে বৈধভাবে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এমন পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে বাধ্য হচ্ছে, যেগুলো একই ধরনের কর ও নিয়ন্ত্রক খরচ বহন করে না।
স্যামসাং হ্যান্ডসেট উৎপাদনকারী এক্সেল টেলিকমের পরিচালক মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন খান বলেন, বৈধ উৎপাদকরা কর ও নিয়ম মেনে ব্যবসা করলেও অবৈধ আমদানির কারণে তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।
অবৈধ ও নকল মোবাইল শনাক্ত করতে জাতীয় সরঞ্জাম পরিচিতি নিবন্ধন ব্যবস্থা বা এনইআইআর চালু করা হয়েছে। এই ব্যবস্থায় মোবাইলের আইএমইআই নম্বর ব্যবহার করে অননুমোদিত ও অবৈধ ডিভাইস শনাক্ত করা হয়।
তবে অবৈধ ফোন বন্ধ করার সুবিধাটি এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। ফলে গ্রে মার্কেট নিয়ন্ত্রণে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না বলে মনে করছেন শিল্প উদ্যোক্তারা।
তাদের মতে, এনইআইআর কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বৈধ বাজার সম্প্রসারিত হবে এবং স্থানীয় কারখানাগুলো উচ্চ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারবে।
বাংলাদেশের মোবাইল উৎপাদকরা এখনো র্যাম, প্রসেসর ও ডিসপ্লের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে যন্ত্রাংশের দাম বাড়লে সরাসরি স্থানীয় উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের স্মার্টফোন বাজারের বড় অংশ ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা দামের মধ্যে। তাই উৎপাদন খরচ বাড়লে এই শ্রেণির ভোক্তারাই সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়বেন।
উৎপাদনের পরিমাণ বাড়াতে পারলে প্রতি ইউনিট খরচ কমানো সম্ভব। কিন্তু দুর্বল চাহিদা, গ্রে মার্কেট এবং প্রতিযোগিতার কারণে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় উৎপাদন পরিসর অর্জন করতে পারছে না।
এদিকে নীতিগত স্থিতিশীলতার অভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন উদ্যোক্তারা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে কর সুবিধা দেওয়ার পর দেশে মোবাইল উৎপাদন খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হয় এবং প্রায় ১৭টি কারখানা গড়ে ওঠে।
তবে পরবর্তীতে কর ও শুল্ক নীতির পরিবর্তনের কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্থানীয় মোবাইল উৎপাদনে ব্যবহৃত ২২টি কাঁচামালের আমদানিতে অগ্রিম আয়কর কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে। পাশাপাশি কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশের কিছু শুল্ক সুবিধা এবং ভ্যাট সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, প্রণোদনা গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতা আরও বেশি প্রয়োজন।
তাদের মতে, বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি বিনিয়োগ ধরে রাখতে স্থিতিশীল কর ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের মোবাইল হ্যান্ডসেট শিল্পের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে গ্রে মার্কেট নিয়ন্ত্রণ, এনইআইআর কার্যকর বাস্তবায়ন, স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তার ওপর। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারলে দেশে শুধু মোবাইল সংযোজন নয়, ভবিষ্যতে আরও বড় প্রযুক্তি উৎপাদন খাত গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

