বার্ষিক আয়কর রিটার্ন জমা দিয়ে করছাড়ের সুবিধা নেওয়ার জন্য করদাতাদের হাতে সময় বাকি আর কেবল চার দিন। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে চলতি অর্থবছরে পরিশোধযোগ্য করের ওপর পাঁচ শতাংশ, বা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা—এই দুইয়ের মধ্যে যা কম, সেই পরিমাণ ছাড় মিলবে। এবারের বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নতুন করে চালু করা এই সুবিধা নিয়েই এখন আলোচনায় করদাতারা।
তবে এই ছাড় ঘিরে করদাতাদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে বেশ কিছুটা বিভ্রান্তি। কারণ সারা বছর অগ্রিম কর, বেতন থেকে কাটা কর কিংবা বিভিন্ন উৎসে পরিশোধ করা কর—এসবের ওপর কোনো ছাড় প্রযোজ্য নয়। রিটার্ন জমার সময় যে অর্থ কর হিসেবে পরিশোধ করতে হয়, মূলত সেই অংকের ওপরই এই সুবিধা কার্যকর হবে।
বিষয়টি একটি উদাহরণ দিয়ে স্পষ্ট করা যায়। ধরা যাক, গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সময়ে একজন করদাতার করযোগ্য আয় হয়েছে সাত লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রথম চার লাখ টাকা করমুক্ত থাকায়, বাকি তিন লাখ টাকার ওপর দশ শতাংশ হারে তাঁর করের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩০ হাজার টাকা। তিনি যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দিয়ে এই টাকা পরিশোধ করেন, তাহলে পাঁচ শতাংশ হারে দেড় হাজার টাকা ছাড় পেয়ে তাঁর দিতে হবে মোট ২৮ হাজার ৫০০ টাকা।
তবে যারা সারা বছর নিয়মিতভাবে কর পরিশোধ করে আসছেন, তাদের জন্য এই নিয়ম কিছুটা অসুবিধাজনক হয়ে উঠতে পারে। কারণ রিটার্ন জমা দেওয়ার আগে যেসব অর্থ অগ্রিম কর বা উৎসে কর হিসেবে ইতিমধ্যে কাটা হয়ে গেছে, তার ওপর এই ছাড় প্রযোজ্য হবে না। যেমন সঞ্চয়পত্রের মুনাফা তোলার সময় কাটা অগ্রিম কর, ব্যাংকের স্থায়ী আমানতের মুনাফায় কাটা উৎসে কর, বা চাকরিজীবীদের বেতন থেকে মাস মাস কাটা কর—এসব অর্থে কোনো ছাড় মিলবে না। শুধু রিটার্নের মোট কর থেকে এই আগাম পরিশোধিত অংশ বাদ দেওয়ার পর যে টাকা বাকি থাকবে, তার ওপরই এই সুবিধা কার্যকর হবে।
এ কারণে সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করছেন, এতে সারা বছর নিয়ম মেনে কর দেওয়া করদাতাদের সঙ্গে একধরনের বৈষম্য তৈরি হচ্ছে—যারা আগেভাগে কর দিয়েছেন, তারা কোনো ছাড় পাচ্ছেন না, অথচ রিটার্ন জমার সময় কর দেওয়া ব্যক্তিরা এই সুবিধা পেয়ে যাচ্ছেন।
সময় গড়ালে এই সুবিধা কমতে থাকবে, বরং উল্টো বাড়তে থাকবে করের বোঝা। চলতি অর্থবছরে রিটার্ন জমার সময়ের ভিত্তিতেই এই কাঠামো সাজানো হয়েছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রথম প্রান্তিকে রিটার্ন জমা দিলে সর্বোচ্চ ছাড় মিলবে। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে জমা দিলে কোনো ছাড়ই থাকবে না, পুরো করই দিতে হবে। জানুয়ারি থেকে মার্চের তৃতীয় প্রান্তিকে জমা দিলে বরং অতিরিক্ত কর গুণতে হবে, এবং এপ্রিল থেকে জুনের চতুর্থ প্রান্তিকে জমা দিলে সেই অতিরিক্ত করের হার আরও বেড়ে যাবে।
অর্থাৎ, সময়মতো তথা সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলেই একজন করদাতা সর্বোচ্চ সুবিধা পাবেন, দেরি করলে ধাপে ধাপে বাড়বে করের বোঝা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে কর শনাক্তকরণ নম্বরধারীর সংখ্যা প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে অর্থাৎ জুলাই ও আগস্টে জমা পড়েছে প্রায় সাড়ে চার লাখ রিটার্ন। সেপ্টেম্বরের হালনাগাদ পরিসংখ্যান এখনো প্রকাশ করেনি রাজস্ব বোর্ড, যদিও গত অর্থবছরে দেশজুড়ে মোট রিটার্ন জমা পড়েছিল প্রায় ৫০ লাখ।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এবার নির্দিষ্ট পাঁচ শ্রেণির করদাতা ছাড়া বাকি সবাইকে অনলাইনে রিটার্ন জমা দিতে হবে। ফলে শেষ সময়ে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
করদাতাদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত করছাড় পাওয়ার এই সুযোগ থাকছে আর কেবল হাতে গোনা কয়েক দিন। এই সময় পার হয়ে গেলে ছাড়ের এই সুবিধা যেমন হাতছাড়া হবে, তেমনি বাড়তি সময় নিলে গুণতে হবে অতিরিক্ত করও।

