দেশের কর-জিডিপি অনুপাত যখন ৬ দশমিক ৮ শতাংশে আটকে আছে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম; তখনই চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের কৌশলগত পরিকল্পনা নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সংস্থাটি এবার রাজস্ব কৌশল সাজিয়েছে ‘থ্রি-আর’ বা তিনটি মূলনীতির ভিত্তিতে; রিকভারি (পুনরুদ্ধার), রেস্টোরেশন (পুনর্বহাল) এবং রিকনস্ট্রাকশন (পুনর্গঠন)। এই তিন স্তম্ভের লক্ষ্য হলো কর প্রশাসনে বিনিয়োগ বাড়ানো, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার, করদাতা সেবার মানোন্নয়ন এবং কর পরিপালন নিশ্চিত করে রাজস্ব আদায়ের গতি বাড়ানো। গত মাসে অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে এনবিআরের উপস্থাপিত প্রতিবেদনে এসব পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত গত ২৫ বছর ধরে মূলত ৭ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে আটকে রয়েছে। ২০১১-১২ থেকে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এটি ৯ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছালেও পরে আবার কমতে থাকে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অনুপাতটি ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশে দাঁড়ায়। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম ১৫ শতাংশের অর্ধেকেরও কম এই অনুপাত। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত এক যুগে সরকারের ব্যয় বেড়েছে ৪ দশমিক ৪৭ গুণ, অথচ এনবিআরের রাজস্ব সংগ্রহ বেড়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৪০ গুণ। সরকারের মোট রাজস্বের প্রায় ৮৬ শতাংশ আসে এনবিআর থেকে। ফলে ব্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজস্ব না বাড়লে বাজেট ঘাটতি এবং ঋণ নির্ভরতা বাড়তেই থাকবে। এই পরিস্থিতিতে কর-জিডিপি অনুপাত ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ শতাংশে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে উন্নীত করার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
‘রিকভারি’ কৌশলের আওতায় রাজস্ব আদায়ে গড়ে ১৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আয়কর ও ভ্রমণ কর থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আদায় হয়েছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে ১০ শতাংশ নিয়মিত প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে অতিরিক্ত ১৪ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা আদায়ের প্রত্যাশা করছে এনবিআর। এছাড়া কর ফাঁকি দেওয়া অর্থ উদ্ধার, উৎসে করের আওতা সম্প্রসারণ, ব্যক্তিশ্রেণির কর কাঠামোয় পরিবর্তন, বিনিয়োগে কর রেয়াত পুনর্নির্ধারণ, মূলধনি মুনাফার ওপর কর আরোপ এবং করসংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে বাড়তি রাজস্ব সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। ‘রেস্টোরেশন’ কৌশলের মূল লক্ষ্য করের আওতা সম্প্রসারণ এবং ব্যবসাবান্ধব রাজস্ব পরিবেশ তৈরি করা। অন্যদিকে ‘রিকনস্ট্রাকশন’ কৌশলের আওতায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি ও স্বেচ্ছায় কর পরিপালন নিশ্চিত করে রাজস্ব আদায়ের গতি বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
চলতি অর্থবছরে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে আয়কর অনুবিভাগের জন্য ২ লাখ ২৩ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) অনুবিভাগের জন্য ২ লাখ ২৩ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা এবং কাস্টমস অনুবিভাগের জন্য ১ লাখ ৫৭ হাজার ৪০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আয়কর খাতে বাড়তি আদায়ের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল, আয়কর গোয়েন্দা বিভাগ ও কর সার্কেলের মাধ্যমে কর ফাঁকি দেওয়া অর্থ উদ্ধার করে ৩ হাজার কোটি টাকা, নিরীক্ষা ও আয়কর আইনের ২১২ ধারায় মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করে ১ হাজার কোটি টাকা, বিলম্বে রিটার্ন জমার সুযোগ দিয়ে ৫০০ কোটি টাকা এবং ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য ৫ শতাংশ করহার পরিবর্তন করে প্রগতিশীল করহার চালু করে ৩ হাজার কোটি টাকা। বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ রেয়াত সীমা ১০ লাখ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ লাখ টাকা নির্ধারণ করে ১ হাজার কোটি টাকা এবং ব্যবসা-থেকে-ব্যবসা মডেলে খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে উৎসে কর আদায় করে ৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে।
ভ্যাট অনুবিভাগ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৬৯ কোটি টাকা আদায় করেছিল। চলতি অর্থবছরে ১০ শতাংশ নিয়মিত প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে অতিরিক্ত ১৫ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা আদায়ের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এছাড়া উন্নয়ন বাজেটের বাস্তবায়ন বাড়ার ফলে ১৫ হাজার কোটি টাকা, তামাক খাত থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা এবং অবৈধ সিগারেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে। ভ্যাট অনুবিভাগের লক্ষ্য হলো ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বিচারাধীন মামলার ৫০ শতাংশ এবং অর্থবছরের মধ্যে অনিষ্পন্ন মামলার অন্তত ৯৫ শতাংশ নিষ্পত্তি করা। অন্যদিকে কাস্টমস অনুবিভাগের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৫৭ হাজার ৪০ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে আদায় হয়েছিল ১ লাখ ১১ হাজার ৬২৩ কোটি টাকা। নিয়মিত প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে ১১ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা এবং বাজেটের বিভিন্ন পদক্ষেপ থেকে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আদায়ের প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। এছাড়া বকেয়া রাজস্ব আদায়, গোয়েন্দা তৎপরতা, পণ্য খালাস-পরবর্তী নিরীক্ষা, নিলাম, আমদানিপণ্যের সঠিক শ্রেণিবিন্যাস এবং বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যমাত্রা অর্জন চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। কারণ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআর তার সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে আদায় করতে পেরেছিল মাত্র ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৮৩ হাজার কোটি টাকা কম। টানা কয়েক বছর ধরেই এনবিআর তার বার্ষিক রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, ‘রাজস্ব শুধু কাগজে-কলমে করের হার বাড়ালেই বাড়ে না। মানুষ আসলে যা পরিশোধ করে এবং সরকার যা পায়, এর মধ্যে বিশাল ফারাক রয়েছে, আর সেই ফারাকটাই হলো রাজস্ব ফাঁস।’ তিনি কর ফাঁসি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। অর্থনীতিবিদ ড. মাশরুর রেজ বলেছেন, ‘এনবিআরের ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী, কারণ বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের রাজস্ব ঘাটতির ইতিহাস রয়েছে।’ তবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আশাবাদী। তিনি বলেছেন, ‘রাজস্ব আদায় খুব ভালো হবে। এনবিআরের সবাই প্রস্তুত। আমরা লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করব।’ এখন দেখার বিষয়, এই ‘থ্রি-আর’ কৌশল কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং দেশের রাজস্ব ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসে কি না।

