রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহুল প্রতীক্षित তৃতীয় টার্মিনাল উদ্বোধনের প্রায় তিন বছর পার হলেও এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি। প্রায় ২১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই বিশাল স্থাপনা বাইরে থেকে যতটা আধুনিক ও চোখজুড়ানো, ভেতরের বাস্তবতা তার সঙ্গে বেশ ভিন্ন। শুল্ক বিভাগের নিজস্ব পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, নতুন এই টার্মিনালে তাদের কার্যক্রম চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর মধ্যে অন্তত পনেরোটি বড় ঘাটতি রয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্ট নথি ও কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ঢাকা কাস্টমস হাউস এই সমস্যাগুলো নিয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে চলতি বছরের ১৬ মার্চেই আনুষ্ঠানিকভাবে অবগত করেছিল। কিন্তু পাঁচ মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো সমাধান না হওয়ায় সম্প্রতি আবারও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের শীর্ষ কর্মকর্তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এই বিষয়ে কাস্টমস কমিশনারের প্রতিক্রিয়া জানার চেষ্টা করা হলেও তা পাওয়া যায়নি, বিমান কর্তৃপক্ষের একাধিক কর্মকর্তার কাছ থেকেও কোনো বক্তব্য মেলেনি।
শুল্ক বিভাগের মূল্যায়ন অনুযায়ী, নতুন টার্মিনালের কাস্টমস হলটি আয়তনে যথেষ্ট সংকীর্ণ। ছাদ নিচু হওয়ায় এবং বাতাস চলাচলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় একসঙ্গে অনেক যাত্রী এলে ভিড় ও সেবায় ধীরগতি তৈরি হতে পারে। হিসাব বলছে, ঘণ্টায় সাত থেকে আট হাজার যাত্রী এই টার্মিনাল দিয়ে চলাচল করতে পারবেন, কিন্তু তাদের ও তাদের লাগেজ সামলানোর মতো জায়গা কাস্টমস হলে নেই।
জব্দ করা মূল্যবান পণ্য, যেমন স্বর্ণ, বৈদেশিক মুদ্রা বা দামি ইলেকট্রনিক সামগ্রী রাখার জন্য কোনো নিরাপদ ও পৃথক গুদাম নেই। এতে নিরাপত্তা, হিসাবরক্ষণ ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এর পাশাপাশি কর্মকর্তাদের বসার মতো পর্যাপ্ত অফিস কক্ষও নেই, এমনকি সহকারী ও যুগ্ম কমিশনার পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্যও নির্ধারিত জায়গা রাখা হয়নি। অথচ অন্য একটি সংস্থাকে বাড়তি জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সন্দেহজনক লাগেজ শনাক্ত হলে তা সাধারণ যাত্রীদের চলাচলের পথ থেকে আলাদা করে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট পথ বা পর্যাপ্ত নজরদারি ব্যবস্থা নেই। এতে নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এ কারণে লাগেজ চিহ্নিতকরণ ও নজরদারির জন্য রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে কাস্টমস।
আধুনিক স্ক্যানার বসানোর জন্য প্রয়োজনীয় জায়গার অভাবও চিহ্নিত হয়েছে। শুধু যন্ত্র বসালেই হবে না, তার পরিচালকদের বসার ব্যবস্থা, আরামদায়ক কর্মপরিবেশ ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি বলে জানানো হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ লাগেজ মূল প্রবাহ থেকে আলাদা করার জন্য স্বয়ংক্রিয় বেল্ট ব্যবস্থাও নেই, ফলে শুধু যন্ত্র থাকলেই কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না বলে মনে করছে কাস্টমস।
আমদানি পণ্যের শারীরিক পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত কোনো ইয়ার্ড নেই, বড় আকারের প্যালেট বা ক্রেটজাত পণ্য স্ক্যান করার মতো জায়গা ও উপযুক্ত দরজা-অবকাঠামোও নেই। স্বয়ংক্রিয় কার্গো ব্যবস্থাপনা থাকলেও তার সঙ্গে কাস্টমসের পরীক্ষণ ও জব্দ প্রক্রিয়ার সমন্বয় নেই, যা চোরাচালানের পণ্য ধরা পড়লে জটিলতা তৈরি করতে পারে। বড় আকারের আমদানি পণ্য রাখার জন্য নিরাপদ গুদামের অভাবেও দ্রুত পণ্য খালাসে বিঘ্ন ঘটতে পারে।
রপ্তানি কার্গো টার্মিনালেও একই ধরনের সমস্যা দেখা গেছে। ব্যাগেজ ও যানবাহন স্ক্যানার বসানোর জায়গা নেই, জব্দ পণ্য রাখার জন্য প্রায় এক হাজার বর্গফুট গুদামের প্রয়োজন থাকলেও তা নেই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, রপ্তানি পণ্যের প্রকৃত ওজন যাচাইয়ের কোনো স্কেলই নেই। ঘোষিত ও প্রকৃত ওজনের গরমিল ধরতে এই স্কেল অপরিহার্য বলে মনে করছে কাস্টমস, কারণ এর মাধ্যমেই ভুল ঘোষণা বা পণ্য গোপনের মতো অনিয়ম শনাক্ত করা সহজ হয়। এছাড়া বড় আকারের রপ্তানি পণ্য সাময়িক রাখার গুদাম এবং শারীরিক পরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত শেডও নেই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাস্টমসের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, টার্মিনাল চালু হলে যাত্রী ও পণ্য চলাচল কয়েকগুণ বেড়ে যাবে, ফলে রাজস্ব আদায়, চোরাচালান রোধ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্বও বাড়বে। কিন্তু এই মৌলিক অবকাঠামোগত ঘাটতি থাকলে আধুনিক টার্মিনালের প্রকৃত সক্ষমতা কাজে লাগানো কঠিন হয়ে যাবে। তার মতে, এই সমস্যাগুলো শুধু অবকাঠামোর বিষয় নয়, বরং রাজস্ব সুরক্ষা, চোরাচালান প্রতিরোধ ও যাত্রীসেবার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাই টার্মিনাল পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর আগেই এসব সমস্যার সমাধান হওয়া প্রয়োজন।
প্রকল্পের ইতিহাস দেখলে জানা যায়, ২০১৭ সালের অক্টোবরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি থেকে অনুমোদন পাওয়া এই প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে। জাপানি ও দক্ষিণ কোরীয় তিনটি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত একটি কনসোর্টিয়াম এই টার্মিনাল নির্মাণ করছে, আর নকশা করেছেন সিঙ্গাপুরের একজন স্থপতি। তিনতলা এই ভবনের মেঝের আয়তন প্রায় দুই লাখ ত্রিশ হাজার বর্গমিটার, যেখানে রয়েছে ১১৫টি চেক-ইন কাউন্টার এবং ডিপারচার ও অ্যারাইভাল মিলিয়ে সোয়া একশোর বেশি ইমিগ্রেশন ডেস্ক। বছরে পাঁচ লাখ টন পর্যন্ত কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যও রয়েছে এই প্রকল্পে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রথম উদ্বোধন হওয়া এই টার্মিনাল যন্ত্রপাতি সমন্বয় ও পরিচালন-সংক্রান্ত জটিলতায় এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে চলতি বছরের ডিসেম্বরে সীমিত পরিসরে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, এবং ধীরে ধীরে আগামী বছরের মাঝামাঝি নাগাদ পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরুর প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তবে চালুর সময় যত ঘনিয়ে আসছে, কাস্টমসের চিহ্নিত এই অবকাঠামোগত সংকটগুলো তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।

