বৈদেশিক অর্থায়নের উৎস আরও বৈচিত্র্যময় করতে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে প্রথমবারের মতো সার্বভৌম বন্ড ছাড়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। এ বন্ডের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে ৫০০ মিলিয়ন থেকে ১ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে বন্ড ইস্যুর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে চূড়ান্ত আকার নির্ধারণ করা হবে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সুপারিশের ভিত্তিতে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগান এবং হংকংভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ব্রিজওয়ার্কস ইন্টারন্যাশনালকে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এ বিষয়ে দুটি পৃথক প্রস্তাব নীতিগতভাবে অনুমোদন দিয়েছে। এখন প্রস্তাবগুলো প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।
সরকার এর আগে জুলাই মাসে সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর সম্ভাব্যতা যাচাই করতে আট সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করে।
এই কমিটিতে অর্থ বিভাগ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের প্রতিনিধিরা রয়েছেন। কমিটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার ঘানি।
সার্বভৌম বন্ডের মাধ্যমে সরকার আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার থেকে সরাসরি অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে। এর ফলে শুধু বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমবে না, বরং ঋণের মেয়াদ বাড়ানো এবং পুনঃঅর্থায়নের ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর, ব্যয় সাশ্রয়ী ও টেকসই করা এবং মধ্যমেয়াদে ঋণ ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখা।
জেপি মরগানকে সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর প্রধান ব্যবস্থাপক, বৈশ্বিক সমন্বয়কারী, বুকরানার এবং সার্বভৌম রেটিং পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষায়িত প্রকৃতির কাজ এবং আন্তর্জাতিক সার্বভৌম বন্ড ব্যবস্থাপনায় জেপি মরগানের অভিজ্ঞতার কারণে সরকারি ক্রয় আইন অনুযায়ী সরাসরি একক উৎস পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
নিয়োগের পর জেপি মরগান আইনি পরামর্শক ও ট্রাস্টি নির্বাচন, অফারিং সার্কুলার প্রস্তুত, বিনিয়োগকারী রোডশো আয়োজন এবং বন্ড ইস্যুর সময় ও কাঠামো নির্ধারণে সহায়তা করবে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও পরামর্শ দেবে প্রতিষ্ঠানটি।
ডলারে ইউরোবন্ডের পাশাপাশি জাপানি ইয়েনে সামুরাই বন্ড এবং চীনা মুদ্রা ইউয়ানে পান্ডা বন্ড ছাড়ার বিষয়ও বিবেচনা করছে সরকার।
এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে শুক্রবার নিউইয়র্কে জেপি মরগান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য একটি বৈঠকের আয়োজন করে। এতে ব্ল্যাকরক, পিমকো, টিপিজি, জেন স্ট্রিট, ম্যাকুয়ারি, গোল্ডেনট্রি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট এবং মেটলাইফসহ ১৫টি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের প্রথম সার্বভৌম বন্ড আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে দেশের জন্য নতুন একটি রেফারেন্স তৈরি করবে এবং বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে আরও যুক্ত করবে।
এদিকে ব্রিজওয়ার্কস ইন্টারন্যাশনালকে এক বছরের জন্য পুঁজিবাজার সংস্কার এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটি সার্বভৌম বন্ড ছাড়াও বিনিয়োগ তহবিল, টেলিযোগাযোগ, ডিজিটাল অবকাঠামো, ডেটা সেন্টার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং বড় অবকাঠামো প্রকল্পে পরামর্শ দেবে।
সরকার আন্তর্জাতিক বন্ড পরিকল্পনার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ পুঁজিবাজারও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে করপোরেট বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড, গ্রিন বন্ড, সুকুক এবং পৌর বন্ডের বাজার সম্প্রসারণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বন্ড বাজারে প্রবেশ বাংলাদেশের জন্য বৈদেশিক অর্থায়নের নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে ঋণের খরচ, বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর।

