বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতিতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলন করেছে গ্লোবাল ডিজিটাল অপারেটর ভিওন ও তার বাংলাদেশি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বাংলালিংক। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাইডলাইনে ‘ইনভেস্ট ইন বাংলাদেশ নাও’ উদ্যোগের আওতায় আয়োজিত এই গোলটেবিল বৈঠকে বাংলাদেশ সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, বৈশ্বিক বিনিয়োগকারী, উন্নয়ন অর্থায়ন প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন দেশের সরকারি প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সম্মেলনে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিতে ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আনার লক্ষ্য তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশের ডিজিটাল খাতে এই প্রথম বড় পরিসরে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের একত্রিত করা হলো, যা দেশের প্রযুক্তি খাতে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে। দেশের ১৭ কোটির বেশি মানুষের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ তরুণ এবং তাদের মধ্যে ডিজিটাল সেবার ব্যবহার বাড়ছে। এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে ডিজিটাল আর্থিক সেবা, কানেক্টিভিটি ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবার বাজার তৈরি হচ্ছে। ভিওনের চেয়ারম্যান ও প্রতিষ্ঠাতা অগি কে ফাবেলা বলেছেন, যেসব দেশের ডিজিটাল সম্ভাবনা এখনো বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছায়নি, সেসব দেশে বিনিয়োগ করে আসছে ভিওন। এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হলো; এটি শুধু একটি কোম্পানির বিনিয়োগ নয়, বরং বাংলাদেশকে বৈশ্বিক বিনিয়োগ মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে তুলে ধরার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। ‘ইনভেস্ট ইন বাংলাদেশ নাও’ উদ্যোগের আওতায় ভিওন প্রাথমিকভাবে ২৫ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা পরবর্তীতে ১০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
সম্মেলনে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এবং বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনিসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধি, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এবং ব্ল্যাকরক, রথসচাইল্ড, ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) ও বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। এই সম্মেলনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ মহলে বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভিওনের চেয়ারম্যান অগি কে ফাবেলা আরও বলেন, বাংলাদেশের বড় তরুণ জনগোষ্ঠী এবং দ্রুত এগিয়ে যাওয়া ডিজিটাল অর্থনীতি ভবিষ্যতের বিনিয়োগের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। অন্য বিনিয়োগকারীদের আগে ভিওন এখানে বিনিয়োগ করছে, যা বাংলাদেশের ভবিষ্যতের প্রতি তাদের দীর্ঘমেয়াদি আস্থার প্রতিফলন।
সম্মেলনে বাংলালিংকের সাম্প্রতিক কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কাছ থেকে স্টারলিংকের ডিরেক্ট-টু-সেল (ডিটুসি)/স্যাটেলাইট-টু-মোবাইল সেবা চালুর অনুমোদন। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকলেও উপযুক্ত ৪জি ফোন সরাসরি স্যাটেলাইটের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারবে। প্রাথমিকভাবে এসএমএস, ডেটা মেসেজিং ও হোয়াটসঅ্যাপ কল সুবিধা পাওয়া যাবে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে এই সেবা চালু করছে। জেলে, প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাসিন্দা ও দুর্যোগকবলিত মানুষের জন্য এই সেবা বিশেষভাবে কার্যকর হবে। এছাড়া সম্মেলনে ভিওন ও স্কয়ার গ্রুপের অংশীদারিত্বে নতুন ডিজিটাল ব্যাংক ‘নোভা ডিজিটাল ব্যাংক’ চালুর অনুমোদনের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি এই যৌথ উদ্যোগসহ পাঁচটি ডিজিটাল ব্যাংককে প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে; অর্থমন্ত্রী এই অনুমোদনের কথা ঘোষণা করেন। চলতি সপ্তাহেই বাংলালিংক পৃথকভাবে নিজেদের ডিজিটাল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম ‘মুক্ত পে’ চালু করেছে, যার মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর, মার্চেন্ট ও বিল পেমেন্ট এবং অর্থ বিতরণ করা যাবে।
বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতিতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নতুন সেবা সম্প্রসারণে ভিওন ও বাংলালিংকের এই উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। বাংলালিংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইওহান বুসে বলেছেন, ‘ডিজিটাল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলালিংকের রূপান্তরের যাত্রায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।’ তিনি আরও বলেন, নিউইয়র্কে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিনিয়োগকারী ও উন্নয়ন অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানগুলোকে একত্রিত করার মাধ্যমে ভিওন বাংলাদেশের জন্য একটি অনন্য সুযোগ তৈরি করেছে। এই সম্মেলনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ মহলে বাংলাদেশের ডিজিটাল খাতের সম্ভাবনা আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হলো। ভবিষ্যতে এই ধরনের উদ্যোগ দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিতে আরও বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নতুন সেবা সম্প্রসারণে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন দেখার বিষয়, ঘোষিত বিনিয়োগ কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয় এবং বাংলাদেশের ডিজিটাল খাতে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনে।

