গ্রামের নারী-পুরুষেরা দিনে দশ-বিশ টাকা করে যে সঞ্চয় জমান, তার সুদ থেকেও এবার উৎসে কর কেটে নিতে চায় সরকার। এ জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিভিন্ন কর কার্যালয় দেশের ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে একের পর এক চিঠি পাঠাচ্ছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, গত দুই অর্থবছরের কর একসঙ্গে জমা দিতে হবে, আর তা করতে হবে আগামীকাল মঙ্গলবারের মধ্যেই। এই সিদ্ধান্তে ক্ষুদ্রঋণ খাতে তীব্র অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
চিঠির নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সদস্যদের সঞ্চয়ের ওপর যে সুদ দেওয়া হয়েছে, তা থেকে ১০ শতাংশ হারে কর হিসাব করতে হবে। সেই টাকা এ-চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে। সময়মতো জমা না দেওয়ায় অতিরিক্ত ২ শতাংশ জরিমানাও গুনতে হবে। রাজস্ব বোর্ডের বক্তব্য, আইন থাকা সত্ত্বেও এত দিন প্রতিষ্ঠানগুলো এই কর কাটেনি, ফলে কোষাগারে কোনো অর্থ জমা পড়েনি।
মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ জুন পর্যন্ত দেশে সনদপ্রাপ্ত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৬৩৩। এগুলোর সদস্য প্রায় ৪ কোটি ৭৩ লাখ। এর মধ্যে ৩ কোটি ৬১ লাখ জন ঋণ নিয়েছেন। সদস্যদের জমা সঞ্চয়ের স্থিতি ৯৫ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। এসব সঞ্চয়ের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানগুলো বছরে ৬ থেকে ১২ শতাংশ হারে সুদ দেয়।
কর কর্তৃপক্ষ ভিত্তি হিসেবে দেখাচ্ছে ২০২৩ সালের আয়কর আইনের ১০২ (১) ধারা। এই ধারায় বলা আছে, ব্যাংক, বিমা কোম্পানি, লিজিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সমবায় কিংবা মোবাইল আর্থিক সেবা কাউকে সুদ বা মুনাফা দিলে দেওয়ার সময়ই কর কেটে রাখতে হবে। কোম্পানি, ট্রাস্ট ও ব্যক্তিসংঘের ক্ষেত্রে কাটতে হয় ২০ শতাংশ। বাকিদের ক্ষেত্রে হার ১০ শতাংশ।
রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্ষুদ্রঋণের সদস্যরা এই ‘বাকিদের’ তালিকায় পড়েন। হিসাবটা এমন: কোনো সদস্য ১০০ টাকা সুদ পেলে ১০ টাকা কেটে রাখা হবে। তিনি হাতে পাবেন ৯০ টাকা, আর ১০ টাকা যাবে সরকারের কোষাগারে।
ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ১২৯টির নেটওয়ার্ক ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম গত ২২ সেপ্টেম্বর সরকারের কাছে লিখিত আবেদন করেছে। আবেদনটি গেছে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এবং মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যানের কাছে। সদস্যদের সঞ্চয়ের সুদ করমুক্ত রাখার দাবি জানানো হয়েছে।
সংগঠনটির প্রধান যুক্তিগুলো এ রকম: প্রথমত, এই সঞ্চয় গরিব পরিবারের কাছে এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক বিমা। অসুখ, বন্যা-ঘূর্ণিঝড়, ফসলের ক্ষতি বা হঠাৎ আয় কমে গেলে এই জমানো টাকাই ভরসা।
দ্বিতীয়ত, সদস্যদের কাছ থেকে আমানত নেওয়া ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত কাজেরই অংশ। ২০০৬ সালের মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি আইনে এই ক্ষমতা দেওয়া আছে। আর ২০১০ সালের বিধিমালা অনুযায়ী আমানতের নির্ধারিত সুদ পাওয়া সদস্যের অধিকার। তাই এত দিন এই সুদকে করমুক্ত ধরেই কাজ চলছিল।
তৃতীয়ত, ক্ষুদ্রঋণের সঞ্চয়ে উৎসে কর কাটার নিয়ম আদৌ প্রযোজ্য কি না, সে বিষয়ে আইনে স্পষ্ট কিছু বলা নেই। সংগঠনটির মতে, এই অস্পষ্টতার সুযোগেই এখন কর আরোপের চেষ্টা হচ্ছে।
সংগঠনের চেয়ারম্যান ও পিপলস ওরিয়েন্টেড প্রোগ্রাম ইমপ্লিমেন্টেশনের নির্বাহী সচিব মুর্শেদ আলম সরকার বলেন, সদস্যরা অতি সামান্য অঙ্কে, দিনে ১০ থেকে ২০ টাকা করে সঞ্চয় করেন। একদিকে সরকার পারিবারিক কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো উদ্যোগে সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করছে। অন্যদিকে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীর সুদ থেকে কর কেটে নেওয়া সেই নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাঁর আশঙ্কা, এতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং গরিব মানুষের মধ্যে সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে উঠবে না।
সংগঠনটির হিসাবে, ২০২৫ সালের ৩০ জুন ক্ষুদ্রঋণ খাতে মোট সঞ্চয় ছিল ৭৯ হাজার ৯৩২ কোটি টাকা। গড়ে ৬ শতাংশ হারে সুদ ধরলে বছরে সুদের অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় ৪ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা। এর ১০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৪৭৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা, কর হিসেবে সরকারের কোষাগারে যাবে।
এখানে একটি বিষয় লক্ষ করার মতো। এই হিসাব এক বছর আগের সঞ্চয়ের ভিত্তিতে করা। এখন সঞ্চয় স্থিতি বেড়ে প্রায় ৯৫ হাজার ৭২০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। একই গড় হারে মোটামুটি হিসাব করলে বার্ষিক কর আদায়ের সম্ভাব্য অঙ্ক আরও বেশি হবে। তবে সুদের হার ৬ থেকে ১২ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করে, তাই প্রকৃত অঙ্ক নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠানভেদে দেওয়া সুদের হারের ওপর।
কর কর্তৃপক্ষ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা কী বলছে: ক্ষুদ্রঋণ ও সঞ্চয় নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থার কর নথি যে কর অঞ্চলে আছে, তার একজন কর কমিশনার নাম প্রকাশ না করে কথা বলেছেন। তিনি জানান, আয়কর আইনে আমানতের মুনাফা থেকে উৎসে কর কাটার বিধান রয়েছে। ব্যক্তির ক্ষেত্রে হার ১০ শতাংশ। কর কর্মকর্তারা কেবল সেই আইনই মানছেন।
তবে তিনি একটি সম্ভাবনার দরজাও খোলা রেখেছেন। তাঁর মতে, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানকে ছাড় দিলে ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানও একই সুবিধা চাইতে পারে। তবু ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক সঞ্চয়কারীদের কথা ভেবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি রাজস্ব বোর্ডকে ছাড় দেওয়ার অনুরোধ জানায়, বোর্ড তা বিবেচনা করতে পারে।
মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানে জমা রাখা ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের সুদে উৎসে কর প্রযোজ্য হওয়ার কথা নয়। তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে খুব শিগগির সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করবে তাঁর সংস্থা।
আসল প্রশ্ন এখন সময় নিয়ে। রাজস্ব বোর্ডের সময়সীমা আগামীকাল শেষ হচ্ছে, অথচ নিয়ন্ত্রক সংস্থা মাত্র আলোচনা শুরু করার কথা বলছে। এই ফাঁকে প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে দুটি কঠিন পথ খোলা। হয় জরিমানাসহ দুই বছরের কর নিজেদের তহবিল থেকে দিতে হবে, নয়তো সদস্যদের হিসাব থেকে পেছন ফিরে টাকা কাটতে হবে। দ্বিতীয় পথে গেলে সদস্যদের আস্থা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি আছে। প্রথম পথে গেলে অনেক ছোট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা নড়বড়ে হয়ে পড়তে পারে।
আইনি অস্পষ্টতা দূর করা এবং ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের জন্য আলাদা ছাড়ের সীমা নির্ধারণ করাই এই জটিলতা মেটানোর সম্ভাব্য পথ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

