টানা চার বছর পতনের পর অবশেষে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে দেশের পাট খাত। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে ১৬ কোটি ২৫ লাখ মার্কিন ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৩৭ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ বেশি। এই ইতিবাচক ধারাকে কাজে লাগিয়ে সরকার পাঁচ বছরের একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করছে, যার লক্ষ্য ২০৩১ সালের মধ্যে পাট রপ্তানি আয় দ্বিগুণ করে ২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও পাট রপ্তানি ৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেড়ে ৮৮ কোটি ৩৭ লাখ ডলারে পৌঁছেছিল, যা এক যুগের মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৮২ কোটি আট লাখ ডলারে।
পাট খাতের রপ্তানি চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি থেকে রেকর্ড ১১৬ কোটি ১৫ লাখ ডলার আয় হয়েছিল। কিন্তু পরের চার বছরে এই আয় কমতে কমতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৮২ কোটি আট লাখ ডলারে নেমে আসে, যা প্রায় ২৯ শতাংশ পতন। এই পতনের পেছনে মূল্য সংযোজিত পণ্যের স্বল্পতা, সীমিত বাজার সম্প্রসারণ, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা এবং ভারতের আরোপিত অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ককে দায়ী করা হচ্ছে। তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসের তথ্য বলছে, বৈশ্বিক বাজারে পাটের তৈরি গৃহসজ্জার পণ্য, শপিং ব্যাগ, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, গার্ডেনিং ও প্যাকেজিং পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। এর সঙ্গে পাটকাঠির তৈরি চারকোলের চাহিদাও বাড়ছে চীনসহ বিভিন্ন দেশে।
ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রথম দুই মাসে কাঁচাপাটের রপ্তানি ৩৬ শতাংশ বেড়েছে, পাটের সুতা রপ্তানি বেড়েছে ৫৮ শতাংশ এবং অন্যান্য পাটপণ্য রপ্তানি থেকে আয় বেড়েছে ৪৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। তবে এই সময়ে পাটের বস্তা ও ব্যাগ রপ্তানি থেকে আয় ১৩ শতাংশ কমেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, গত বছর বন্যার কারণে পাট উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কাঁচা পাটের দাম বেড়ে যায়। ফলে রপ্তানির পরিমাণ না বাড়লেও মূল্যের বিচারে আয় বেড়েছে। রপ্তানিকারকরা বলছেন, বিশ্ববাজারে চাহিদা বাড়লে এবং কাঁচা পাটের সরবরাহ স্থিতিশীল থাকলে আগামীতে পরিমাণ ও মূল্য উভয় দিক থেকেই প্রবৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে। পাটজাত পণ্যের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর মধ্যে রয়েছে তুরস্ক, চীন, ভারত, মিশর, উজবেকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মরক্কো, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান, পাকিস্তান, রাশিয়া ও ইরান।
সরকার ইতোমধ্যে ‘বাংলাদেশ পাট খাত উন্নয়ন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা (২০২৬-২০৩১)’ নামে একটি খসড়া প্রস্তুত করেছে, যা বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধীন পাট অধিদপ্তরের তৈরি। এই কর্মপরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো ২০৩১ সালের মধ্যে পাট ও পাটজাত পণ্যের বার্ষিক রপ্তানি আয় বর্তমান ৮২ কোটি ডলার থেকে ১৬৪ কোটি ডলারে উন্নীত করা। একই সঙ্গে কাঁচা পাটের উৎপাদন ১১৫ থেকে ১২০ লাখ বেলে উন্নীত করা, দেশীয় উৎপাদনের মাধ্যমে ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ পাটবীজের চাহিদা পূরণ এবং মূল্য সংযোজিত পণ্যের অংশ ৪৫ শতাংশ থেকে ৭০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে ৩ হাজার ৭০০ কোটি থেকে ৪ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা সরকারি তহবিল, বেসরকারি বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগী এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে।
কর্মপরিকল্পনায় পাট খাতের আটটি কৌশলগত স্তম্ভের কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে খামার উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, মানসম্মত বীজ সরবরাহ নিশ্চিত করা, পাটকল আধুনিকীকরণ, গবেষণা ও উদ্ভাবন সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার স্থাপন। বর্তমানে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষাগারের অভাবে রপ্তানিকারকদের নমুনা বিদেশে পাঠাতে হয়, যেখানে একটি পণ্য পরীক্ষা করতে ৫০০ থেকে ২ হাজার ডলার খরচ হয় এবং সময় লাগে ১০ থেকে ২১ দিন। অথচ ভারতে একই পরীক্ষা হয় মাত্র ৬০ থেকে ১৫০ ডলারে, মাত্র তিন থেকে সাত দিনে। এই বাড়তি খরচ বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। কর্মপরিকল্পনায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন পরিবেশগত নিয়মকানুন মেনে চলার প্রস্তুতি, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও উৎপাদনকারীদের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার এবং পাট মূল্য শৃঙ্খলে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর সুপারিশও করা হয়েছে।
বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তপন প্রামাণিক বলেন, স্বাধীনতার পর দেশের ৯০ শতাংশের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় হতো এই খাত থেকে। কিন্তু পরে নানা কারণে পাট খাত পথ হারিয়ে ফেলে এবং তৈরি পোশাক শিল্পে মনোযোগ চলে যায়। তিনি মনে করেন, কাঁচা পাটের সরবরাহ স্থিতিশীল থাকলে এবং নতুন বাজারে প্রবেশের জন্য প্রণোদনা দিলে পাটপণ্যের রপ্তানি সহজেই ২ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব। ডাইভার্সিফাইড পাটপণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ক্রিয়েশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশেদুল করিম বলেছেন, পাটের সুতা ও বস্তা থেকে ব্যবসায়ীরা খুব কম মুনাফা পান, তাই কাঁচা পাটের দাম বাড়লে তা সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাঁর মতে, পাট রপ্তানি বাড়াতে হলে বহুমুখী পণ্য উৎপাদনের কোনো বিকল্প নেই এবং নতুন পণ্য ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে।
পাট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সৈয়দ মো. নুরুল বাসির বলেছেন, ‘পাটের হারানো সুদিন পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা সম্ভব নাও হতে পারে। তবে আমরা যে পথ হারিয়ে ফেলেছি, সেটি খুঁজে বের করে আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি।’ পাঁচ বছর মেয়াদে পাট খাতের রপ্তানি ২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা গেলে সেটিকে বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বজুড়ে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে প্রাকৃতিক আঁশের দিকে ঝোঁক বাড়ছে, যা বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে প্রযুক্তি ও গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, বাণিজ্যিক কূটনীতি জোরদার করতে হবে এবং মান নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করতে হবে। বাংলাদেশকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাট উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও, বাজারজাতকরণে এখনো অনেক দুর্বলতা রয়েছে। পাট খাতের সাফল্য এখন অনেকটাই নির্ভর করছে সরকারের নীতি বাস্তবায়ন, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং রপ্তানি বাজারের বৈচিত্র্যের ওপর।

