দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন টানা কমতে কমতে গত ১৮ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। বড় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মজুদ কমে যাওয়া, নতুন অনুসন্ধানে ধীরগতি এবং উৎপাদন বাড়াতে না পারায় জ্বালানি খাতে চাপ বাড়ছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে গ্যাস উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৬০৭ দশমিক ৯ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ)। এর আগের অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ৬৯২ দশমিক ২ বিলিয়ন ঘনফুট।
অর্থাৎ এক বছরে গ্যাস উৎপাদন কমেছে ৮৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ঘনফুট বা প্রায় ১২ শতাংশ। এ নিয়ে টানা পাঁচ বছর দেশে গ্যাস উৎপাদন কমেছে।
২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে গ্যাস উৎপাদন ছিল ৭৯৯ দশমিক ৭ বিলিয়ন ঘনফুট। তিন বছরের ব্যবধানে উৎপাদন কমেছে প্রায় ২৪ শতাংশ।
দেশে গ্যাস উৎপাদন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল ২০১৫-১৬ অর্থবছরে। ওই সময় উৎপাদন ছিল ৯৭৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ঘনফুট। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন কমছে।
বর্তমানে দেশের উত্তোলনযোগ্য গ্যাস মজুদের বড় অংশ ইতোমধ্যে ব্যবহার হয়ে গেছে। গত জুন শেষে উত্তোলনযোগ্য মজুদের মাত্র ২৫ দশমিক ২১ শতাংশ অবশিষ্ট ছিল।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট উত্তোলনযোগ্য গ্যাস মজুদের পরিমাণ প্রায় ২৯ হাজার ৯২৬ বিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে জুন পর্যন্ত উত্তোলন করা হয়েছে ২২ হাজার ৩৮২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ঘনফুট।
গ্যাস উৎপাদন কমার অন্যতম কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বড় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মজুদ কমে যাওয়াকে উল্লেখ করছেন। বিশেষ করে মার্কিন কোম্পানি শেভরনের অধীন গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে সরবরাহ কমছে।
২০২০-২১ অর্থবছরে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের ৬৫ শতাংশ আসত আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি (আইওসি) থেকে। গত অর্থবছরে তা কমে ৫৯ শতাংশে নেমেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শেভরনের বর্তমান উৎপাদন আরও কমে গেলে তা পূরণ করার মতো সক্ষমতা দেশীয় কোম্পানিগুলোর নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক বদরূল ইমাম বলেন, আগামী কয়েক বছরে শেভরনের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। সে পরিমাণ গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ করার মতো প্রস্তুতি দেশীয় কোম্পানিগুলোর নেই।
দেশে গ্যাসের ঘাটতি পূরণে সরকার উচ্চমূল্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করছে। তবে এলএনজি দিয়েও ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়ছে শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও আবাসিক খাতে। বিশেষ করে শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ কমে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
বর্তমানে দেশে সবচেয়ে বেশি গ্যাস সরবরাহ করছে শেভরন। কোম্পানিটির বিবিয়ানা, জালালাবাদ ও মৌলভীবাজার গ্যাসক্ষেত্র থেকে দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় গ্রিডে বড় অংশের গ্যাস সরবরাহ হয়েছে।
তবে শেভরনের ক্ষেত্রগুলোর মজুদও দ্রুত কমে আসছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, নতুন অনুসন্ধান ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ না নেওয়া হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে গ্যাস খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, দেশীয় কোম্পানির সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর কার্যকর পরিকল্পনা প্রয়োজন।

