কম মূলধনে বেশি মানুষের কাজ জোটাতে পারে, এমন শিল্প খাতকেই আগামী দিনে অগ্রাধিকার দেবে সরকার। শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এ কথা জানিয়েছেন। তাঁর মতে, জনসংখ্যা বেশি আর জমি সীমিত হওয়ায় শ্রমঘন উৎপাদন শিল্পই দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সবচেয়ে কার্যকর পথ।
গতকাল সোমবার রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের (বিআইএম) মিলনায়তনে বাংলাদেশ শিল্প কারিগরি সহায়তা কেন্দ্রের (বিটাক) এক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। সেখানে তিনি ছিলেন প্রধান অতিথি। অনুষ্ঠানে বিটাকের ‘আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচন (ফেজ-২)’ প্রকল্পের প্রশিক্ষণার্থীদের হাতে সনদ ও নিয়োগপত্র তুলে দেওয়া হয়। বিভিন্ন শ্রেণিতে ৭২২ জন সনদ পেয়েছেন। আর ৬৪২ জনকে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে চাকরির নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, বিশ্ব শিল্প ব্যবস্থার সঙ্গে তাল মেলাতে হলে সব স্তরে ও সব পেশায় আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ জনবল গড়তে হবে। এ জন্য দেশ-বিদেশের আধুনিক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিল রেখে পাঠ্যক্রম উন্নত করা হচ্ছে। প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য নতুন সুযোগও তৈরি হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, উৎপাদন শিল্পের পরিসর যত বাড়বে, দক্ষ জনবলের চাহিদাও তত বাড়বে। বিটাক পুরোপুরি সরকারি অর্থায়নে প্রশিক্ষণ দিয়ে এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
শিল্প খাতের নির্দিষ্ট উদাহরণও দিয়েছেন মন্ত্রী। তাঁর মতে, চামড়া, পাদুকা এবং অচামড়া বা কৃত্রিম চামড়াভিত্তিক শিল্প একসঙ্গে বড় পরিসরে কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে। তাই আগামীতে অগ্রাধিকার পাওয়া খাতগুলোর মধ্যে এটি থাকবে।
ভবিষ্যতে বিটাকের এ ধরনের কর্মসূচির পরিধি বাড়ানো হবে বলেও জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, প্রশিক্ষণ শেষে কাজের সুযোগ পাওয়াই এ কর্মসূচির বড় সাফল্য। প্রশিক্ষণার্থীরা দক্ষতা অর্জন করে সরাসরি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কাজ পাচ্ছেন, এটাই কর্মসূচির সবচেয়ে বড় সার্থকতা। মন্ত্রী জানান, প্রকল্পের আকার আরও বড় করা হবে। বিটাককে আরও আধুনিক ও সক্ষম প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়া হবে। শিল্পের ভবিষ্যৎ চাহিদা মাথায় রেখে প্রশিক্ষণের পাঠ্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিকসের মতো আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করার কথাও তিনি বলেন।
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি ছিলেন শিল্প সচিব আব্দুন নাসের খান। তিনি বলেন, প্রযুক্তি ও শিল্পের চাহিদা প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে। এই বদলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন দক্ষতা অর্জন করতে হবে। কারিগরি দক্ষতা কোনোভাবেই উচ্চশিক্ষার চেয়ে কম মর্যাদার নয়, বলেন তিনি। আধুনিক শিল্প ও অর্থনীতির বিকাশে কারিগরি দক্ষ মানুষের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই নিজেদের দক্ষতা ও জ্ঞান নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বিটাকের মহাপরিচালক মো. সাইফুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বিআইএমের মহাপরিচালক মো. সলিম উল্লাহ, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. নুরুজ্জামান, আরএফএলের উপমহাব্যবস্থাপক তারেক আজিজ এবং ম্যাটাডোর গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক এইচএম আল মামুন।
এই ঘোষণার পেছনের যুক্তি বুঝতে দেশের কর্মসংস্থানের বাস্তবতা দেখা দরকার। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে ঢোকেন। অথচ পুঁজিঘন শিল্প, অর্থাৎ যেখানে যন্ত্র ও বিনিয়োগ বেশি লাগে কিন্তু লোক কম লাগে, সেই খাত সবার কাজ দিতে পারে না। শ্রমঘন শিল্পে বিনিয়োগের তুলনায় কাজের সুযোগ বেশি তৈরি হয়। তৈরি পোশাক খাতের বিকাশ এর প্রমাণ। মন্ত্রী চামড়া ও পাদুকা খাতকে সামনে এনে মূলত নতুন এক শ্রমঘন খাতকে পোশাকের পাশে দাঁড় করাতে চাইছেন। এতে রপ্তানির ঝুঁকি একটি খাতে সীমাবদ্ধ না থেকে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে নীতির ঘোষণা আর বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান থাকে। মন্ত্রী অগ্রাধিকারের কথা বলেছেন, কিন্তু কী ধরনের প্রণোদনা, ঋণসুবিধা বা কর ছাড় দেওয়া হবে, তা অনুষ্ঠানের বক্তব্যে আসেনি। এসব সহায়তা ছাড়া নতুন শিল্প খাত দাঁড়ানো কঠিন। বিশেষ করে চামড়া ও পাদুকা খাতে পরিবেশগত মান, কাঁচামালের জোগান ও রপ্তানি বাজারের প্রতিযোগিতা বড় চ্যালেঞ্জ। এগুলোর সমাধান নিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এখনো সামনে আসেনি।
অনুষ্ঠানের সংখ্যাগুলোও আলাদা করে দেখার মতো। সনদ পেয়েছেন ৭২২ জন, নিয়োগপত্র পেয়েছেন ৬৪২ জন। দুটি সংখ্যা তুলনা করলে দেখা যায়, নিয়োগপত্রের সংখ্যা সনদের প্রায় ৮৯ শতাংশ। এটি প্রশিক্ষণ ও চাকরির মধ্যে ভালো সংযোগের ইঙ্গিত দেয়। তবে দুটি সংখ্যা একই দলের কি না, প্রতিবেদনে তা স্পষ্ট নয়। তাই সনদ পাওয়া প্রায় প্রতি ১০ জনের ৯ জন চাকরি পেয়েছেন, এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না। এ ছাড়া এসব নিয়োগ কোন খাতে, কত বেতনে এবং কতদিনের জন্য, সে তথ্যও নেই।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রশিক্ষণের সঙ্গে শিল্পের সরাসরি যোগ। অনুষ্ঠানে আরএফএল ও ম্যাটাডোর গ্রুপের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয়, বিটাক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করছে। প্রশিক্ষণ যদি বাজারের চাহিদা অনুযায়ী না হয়, তাহলে প্রশিক্ষিত মানুষ কাজ পান না। উল্টো দিকে, শিল্প যদি দক্ষ লোক না পায়, তাহলে তাদের বিকাশও আটকে যায়। নিয়োগপত্র বিতরণের এই আয়োজন সেই ফাঁক কমানোর একটি চেষ্টা।
মন্ত্রী পাঠ্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিকস যুক্ত করার কথা বলেছেন। এটি ভবিষ্যৎমুখী পদক্ষেপ, কিন্তু একই সঙ্গে একটি প্রশ্নও তোলে। সরকার একদিকে শ্রমঘন শিল্পকে অগ্রাধিকার দিতে চায়, অন্যদিকে প্রশিক্ষণে স্বয়ংক্রিয়তার প্রযুক্তি আনছে। দুটি লক্ষ্য একসঙ্গে চলতে পারে, যদি প্রযুক্তি শ্রমিকের জায়গা না নিয়ে তাঁর দক্ষতা বাড়ায়। বিশ্বজুড়ে কারখানায় স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে, তাই কর্মীদের সেই যন্ত্র চালানো ও রক্ষণাবেক্ষণের দক্ষতা দিতে পারলে তাঁরা এগিয়ে থাকবেন। কাজেই প্রশিক্ষণ কীভাবে সাজানো হবে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে।
সচিবের বক্তব্যও উল্লেখযোগ্য। তিনি কারিগরি দক্ষতাকে উচ্চশিক্ষার চেয়ে কম মর্যাদার নয় বলেছেন। এটি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলের আহ্বান। আমাদের সমাজে অনেক সময় কারিগরি শিক্ষাকে দ্বিতীয় পছন্দ ধরা হয়। এই ধারণা না বদলালে তরুণেরা প্রশিক্ষণে আগ্রহী হবেন না, আর সরকারের উদ্যোগ পুরোপুরি ফল দেবে না।
সব মিলিয়ে বার্তাটি পরিষ্কার। সরকার কম পুঁজিতে বেশি কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দিতে চায় এবং দক্ষ জনবল তৈরিকে সেই লক্ষ্যের সঙ্গে জুড়ছে। তবে এই ঘোষণা কাজে রূপ নেবে কি না, তা দেখা যাবে বাজেটে বরাদ্দ, প্রণোদনার ঘোষণা এবং প্রকল্পের আকার বাড়ানোর সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে। সেই ধাপগুলো এলেই বোঝা যাবে, এটি কেবল প্রতিশ্রুতি, নাকি সত্যিকারের নীতিগত মোড় ঘোরানো।

