দেশের বাজারে প্রোটিনের সবচেয়ে সহজলভ্য উৎস ফার্মের ডিম ও ব্রয়লার মুরগির দাম গত কয়েক মাস ধরেই সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায় এর পেছনে শুধু খুচরা বিক্রেতাদের কারসাজি নয় বরং মূল সংকট লুকিয়ে আছে খামারের একেবারে প্রাথমিক স্তরে।
দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক গণমাধ্যম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদনে পোলট্রি শিল্পের এই পেছনের দিকটি বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি বলছে গত এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে পোলট্রি ফিড বা পশুখাদ্যের মূল কাঁচামালের দাম ক্ষেত্রবিশেষে প্রায় সাতাশ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। এর ফলে বাধ্য হয়ে ফিড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আগস্ট মাসের পর থেকে দুই দফায় প্রস্তুত খাদ্যের দাম বাড়িয়েছে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো আগস্টের শুরুতে আটষট্টি টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া ফিডের দাম বর্তমানে বাহাত্তর টাকা পঞ্চাশ পয়সায় উঠলেও ফিড মিল মালিকরা দাবি করছেন প্রতি কেজিতে তাদের এখনও তিন টাকার বেশি লোকসান গুনতে হচ্ছে।
পোলট্রি খাদ্যের বাজারে এই ভয়াবহ অস্থিরতার কারণ খুঁজতে গিয়ে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সরবরাহ ব্যবস্থার বেশ কিছু গুরুতর ত্রুটি সামনে এসেছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের তথ্য অনুযায়ী গত এক মাসে বিশ্ববাজার ও স্থানীয় বাজার মিলিয়ে ভুট্টার দাম প্রায় চব্বিশ শতাংশ এবং সয়াবিন মিলের দাম বিশ শতাংশ বেড়েছে।
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের বরাত দিয়ে জানা যায় শুধুমাত্র আগস্ট মাসেই আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন সয়াবিনের দাম চারশো ত্রিশ ডলার থেকে লাফিয়ে পাঁচশো ত্রিশ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। এর পাশাপাশি ফিড তৈরির অন্যতম প্রধান উপাদান ডি অয়েলেড রাইস ব্র্যান বা ডিওআরবির দাম এক ধাক্কায় সাতাশ শতাংশ বেড়ে গেছে।
কাঁচামালের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডলারের অস্থিতিশীল বিনিময় হার এবং দেশের ভেতরের গ্যাস বিদ্যুতের তীব্র সংকট। শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা বলছেন একটি মানসম্মত পশুখাদ্য উৎপাদনের মোট খরচের আশি থেকে পঁচাশি শতাংশই যায় কাঁচামাল কেনায়, তাই বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে স্থানীয় বাজারে তার প্রভাব পড়াটা অবশ্যম্ভাবী।
খাদ্য উৎপাদনের এই সংকটের সরাসরি শিকার হচ্ছেন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার প্রান্তিক খামারি। একটি পোলট্রি খামারের মোট ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশটি বরাদ্দ থাকে মুরগির খাদ্যের পেছনে। গাজীপুর থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের খামারিদের অবস্থা এখন রীতিমতো করুণ।
পঞ্চাশ কেজি ওজনের এক বস্তা পোলট্রি ফিডের দাম এখন সর্বোচ্চ তিন হাজার ছয়শো পঁচাত্তর টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। রাইস ব্র্যানের বস্তা প্রতি দাম বেড়েছে প্রায় পাঁচশো টাকা।
খাবারের এই বাড়তি দাম মেটাতে না পেরে অনেক খামারি মুরগিকে পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া কমিয়ে দিয়েছেন এবং নতুন করে মুরগির বাচ্চা কেনাও বন্ধ করে দিয়েছেন। উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাজারে সেই অনুপাতে মুরগির দাম না পাওয়ায় গত কয়েক মাস ধরে রাজশাহী গাজীপুর পাবনাসহ বিভিন্ন জেলায় খামারিরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করতে বাধ্য হয়েছেন। এর সঙ্গে লোডশেডিংয়ের কারণে শেডে মুরগির বাচ্চা মারা যাওয়ার ঘটনা তাদের লোকসানের পাল্লাকে আরও ভারী করে তুলেছে।
সংকট সমাধানে খামারি এবং পোলট্রি শিল্পের নেতারা সরকারের কাছে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক দাবি তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশ মার্জিনাল পোলট্রি ফারমার্স কাউন্সিলের পক্ষ থেকে দেশীয় ডিওআরবি ও রাইস ব্র্যানের সরবরাহ যেন সবার আগে স্থানীয় চাহিদা মেটাতে ব্যবহৃত হয় সেই দাবি জানানো হয়েছে।
খামারিদের মতে কৃত্রিম সংকট রোধ করতে বাজার তদারকি জোরদার করার পাশাপাশি আমদানি করা কাঁচামালের ওপর থেকে ভ্যাট ট্যাক্স ও শুল্ক অবিলম্বে প্রত্যাহার করা প্রয়োজন। শিল্পের এই নাজুক অবস্থার বিষয়টি সরকারের নজরেও এসেছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে সরকার পশুখাদ্যসহ অন্যান্য উৎপাদন উপকরণের খরচ কমিয়ে আনার জন্য কাজ শুরু করেছে। নীতি নির্ধারকরাও এখন বুঝতে পারছেন যে উৎপাদন পর্যায়ে খরচ কমানো ছাড়া দেশের সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী দামে নিরাপদ পোলট্রি পণ্য নিশ্চিত করার কোনো জাদুকরি উপায় নেই।
তবে নীতিনির্ধারকদের আশ্বাসের ফলাফল বাজারে দৃশ্যমান হওয়ার আগেই সাধারণ ভোক্তাদের পকেটে টান পড়তে শুরু করেছে। পশুখাদ্যের দাম বাড়ায় খামারে যে উৎপাদন ঘাটতি তৈরি হয়েছে তার সোজা প্রভাব গিয়ে পড়েছে ঢাকার বড় বাজারগুলোর ওপর। সাম্প্রতিক বন্যা অতিবৃষ্টি এবং অতিরিক্ত গরমের কারণে আগে থেকেই মুরগির মৃত্যুহার বেশি ছিল। তার ওপর খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক খামারি নতুন করে উৎপাদনে ফেরেননি।
সরবরাহ ব্যবস্থায় এই বিশাল ঘাটতির কারণে কারওয়ান বাজারের মতো বড় পাইকারি ও খুচরা বাজারগুলোতে ব্রয়লার মুরগি এখন একশো নব্বই থেকে দুইশো টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে ফার্মের ডিমের দামও ডজন প্রতি একশো পঞ্চাশ টাকায় গিয়ে স্থির হয়েছে। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এবং খামারিরা কম খরচে উৎপাদন করতে না পারা পর্যন্ত ক্রেতাদের এই চড়া দামেই প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে হবে।

