জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বাড়লেও বাজারে পণ্যের দাম হঠাৎ বাড়াতে চাইছে না দেশের বড় ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। পরিবর্তে উৎপাদন ব্যয় কমানো, পণ্যের পরিমাণ সামান্য কমানো, বিক্রয় ব্যবস্থায় পরিবর্তন এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে বাড়তি চাপ সামলানোর চেষ্টা করছে তারা।
আগামী দিনে বিস্কুট, মসলা কিংবা অন্যান্য প্যাকেটজাত পণ্যের আকার কিছুটা ছোট হতে পারে। আবার আটা, ময়দা ও সুজির মতো পণ্যে বিক্রেতাদের কমিশন কমতে পারে। কিছু প্রতিষ্ঠান পণ্যের উপাদান ব্যবহারে পরিবর্তন আনার কথাও ভাবছে।
তরল সাবান বা ডিটারজেন্টের মতো পণ্যে কার্যকারিতা ঠিক রেখে উপাদানের পরিমাণ সামঞ্জস্য করার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। কারখানাগুলোতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো এবং একই জনবল দিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টাও চলছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, সাম্প্রতিক জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। তবে দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় সরাসরি পণ্যের দাম বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে জ্বালানি তেলের নতুন মূল্য সমন্বয়ে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের দাম প্রতি লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়। এর প্রভাব পড়ে পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে কৃষিপণ্য, খাদ্যপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর ওপর।
দেশীয় দ্রুত বিক্রয়যোগ্য পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, গত কয়েক বছরে জ্বালানি ও জ্বালানি-সংশ্লিষ্ট ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ব্যবসার মোট খরচ প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। কিন্তু সেই বাড়তি খরচ পুরোপুরি ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরী বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ার পরও প্রতিষ্ঠানটি পণ্যের দাম বাড়ায়নি। বরং বিভিন্ন খাতে ধীরে ধীরে ব্যয় কমানোর চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভোক্তারা নির্দিষ্ট দামের পণ্যে অভ্যস্ত। এক টাকা, দুই টাকা, পাঁচ টাকা বা দশ টাকার মতো নির্দিষ্ট দামের পণ্য বাজারে সহজে গ্রহণযোগ্য হয়। তাই পাঁচ টাকার পণ্য ছয় টাকা করা অনেক ক্ষেত্রে কঠিন।
এ কারণে কিছু ক্ষেত্রে প্যাকেটের আকার বা পণ্যের ওজন কমানোর মতো সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে বলে জানান তিনি।
আহসানের মতে, এটি ব্যবসা টিকিয়ে রাখার একটি কৌশল। কিছু ছোট পণ্য খোলা অবস্থায় সরবরাহ করলে প্যাকেটজাত ব্যয় কমানো সম্ভব এবং এতে কিছু ক্ষেত্রে ভোক্তার খরচও কমতে পারে।
রাজধানীর বিভিন্ন সুপারশপেও দেখা গেছে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর এখনো অনেক পণ্যের খুচরা দাম পরিবর্তন করা হয়নি। স্বপ্ন ও মীনা বাজারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, নতুন করে বড় কোনো মূল্য পরিবর্তন হয়নি।
স্বপ্নের পণ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী পরিচালক নিয়াজ মোর্শেদ বলেন, জ্বালানি তেলের সর্বশেষ মূল্যবৃদ্ধির পর এখনো পণ্যের দাম সমন্বয় করা হয়নি।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজও জানিয়েছে, জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বাড়লেও তারা এখনো পণ্যের দাম বাড়ায়নি এবং দ্রুত বাড়ানোর পরিকল্পনাও নেই।
প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বলেন, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব ব্যবসা ও ভোক্তা উভয়ের ওপর পড়ছে। ঢাকা থেকে দিনাজপুরে একটি ট্রাক পাঠানোর খরচ ২০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৩০ হাজার টাকায় উঠেছে।
তিনি বলেন, পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে ব্যবসার মুনাফার জায়গা সংকুচিত হচ্ছে। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে কোম্পানিগুলোকে মুনাফা কমাতে হতে পারে। একই সঙ্গে খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন ও বিভিন্ন সুবিধাও কমতে পারে।
এসিআই কনজ্যুমার ব্র্যান্ডসও জানিয়েছে, হঠাৎ করে পণ্যের দাম বাড়ানো যায় না। কারণ ভোক্তার আচরণ ও ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনা করতে হয়।
প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মো. কামরুল হাসান বলেন, বাজারে পণ্যের নির্ধারিত মূল্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হঠাৎ দাম বাড়লে ভোক্তারা পণ্য কেনা কমিয়ে দিতে পারেন, যা ব্যবসায় প্রভাব ফেলে।
তিনি জানান, গত দুই বছর ধরে জ্বালানি ও অন্যান্য ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মুনাফার ওপর চাপ রয়েছে। নতুন করে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সেই চাপ আরও বাড়িয়েছে।
সিটি গ্রুপও জানিয়েছে, তারা বাজারের চাপ নিজেরা সামলানোর চেষ্টা করছে এবং ভোক্তা ও বিক্রেতাদের ওপর প্রভাব কমানোর উদ্যোগ নিচ্ছে।
আরএফএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরএন পল জানান, সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির মুনাফার হার ৩ শতাংশ থেকে কমে প্রায় ১ শতাংশে নেমেছে।
তিনি বলেন, ভোক্তারা বাড়তি দাম গ্রহণ করতে পারছেন না বলে প্রতিষ্ঠানটি মুনাফার একটি অংশ ছাড় দিচ্ছে। ব্যয় কমাতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার, শ্রম উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং অন্যান্য কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে।
তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে এভাবে চাপ সামলানো কঠিন হতে পারে। স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. পারভেজ সাইফুল ইসলাম বলেন, ব্যবসা ১০ শতাংশ বাড়লেও আগের মতো মুনাফা ধরে রাখা এখন কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিষ্ঠানগুলো আপাতত দাম না বাড়িয়ে বিভিন্ন কৌশলে পরিস্থিতি সামাল দিলেও দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি সরবরাহ ও ভোক্তার সক্ষমতা—এই তিনটি বিষয়ই বাজারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

