তেলের দাম বেড়েছে, মূল্যস্ফীতির চাপ কমছে না, আর নতুন বিনিয়োগ আসছে না। এই তিন ঝুঁকি একসঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে। ফলে প্রবৃদ্ধি ধীর হচ্ছে, কর্মসংস্থানও আশানুরূপ বাড়ছে না। সর্বশেষ সংকেত এসেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছ থেকে। সংস্থাটি চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৪ শতাংশে নামিয়েছে। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এই ঝুঁকিগুলো মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানো এবং বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নের পরামর্শ দিয়েছে।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে আইএমএফের বোর্ড সভায় বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়। সংস্থাটি ভোগ ও চাহিদার ভারসাম্য রক্ষার কথাও বলেছে। বাংলাদেশ সফরকারী আইএমএফ মিশনের সর্বশেষ মূল্যায়নেও একাধিক ঝুঁকির কথা এসেছে। সংস্থার ভাষ্য, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম ও সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি করেছে। এতে বাংলাদেশের আমদানি ও ভর্তুকি ব্যয় বেড়েছে এবং মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ পড়েছে।
এডিবি জুলাইয়ে বলেছিল, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হবে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। সেপ্টেম্বরের আঞ্চলিক পূর্বাভাসে তা কমিয়ে ৪ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ মাত্র দুই মাসে আধা শতাংশ পয়েন্ট ছাঁটাই। অঙ্কটি ছোট মনে হলেও এর তাৎপর্য বড়। এত অল্প সময়ে পূর্বাভাস বদলানো মানে পরিস্থিতির অবনতি সংস্থাটির প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত হয়েছে। সংস্থাটি এই ছাঁটাইয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে দুর্বল বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের কথা বলেছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারও তৎপর হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সম্প্রতি সংশ্লিষ্টদের নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন। সেখানে তিনি সংকট মোকাবিলায় দ্রুত সাড়া দেওয়ার কৌশল এবং মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর সংস্কার নিয়ে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বিভাগীয় প্রধানদের নির্দেশনা দিয়েছেন।
প্রথম ঝুঁকিটি জ্বালানি। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বাড়ায় গত ২১ সেপ্টেম্বর সরকার ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছে। এর পরপরই সব ধরনের পরিবহন ভাড়া বেড়েছে। প্রতিবেদনে আগের দামের উল্লেখ নেই, তাই শতাংশ হিসাবে এই বৃদ্ধি কত, তা বলা যাচ্ছে না। তবে প্রভাবের ধারাটি স্পষ্ট। জ্বালানির দাম বাড়লে প্রথম ধাক্কা লাগে পরিবহনে। তারপর বাড়ে পণ্য পরিবহন ও উৎপাদনের খরচ। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি ব্যয় গিয়ে পড়ে ভোক্তার ঘাড়ে। কৃষি, শিল্প ও সরবরাহ ব্যবস্থা, সব জায়গায়ই এর ছোঁয়া লাগে। এডিবিও তাদের সেপ্টেম্বরের আঞ্চলিক মূল্যায়নে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতকে বড় ঝুঁকি বলেছে। সংঘাত লম্বা হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে দাম ও অস্থিরতা দুটিই বাড়তে পারে।
দ্বিতীয় ঝুঁকি মূল্যস্ফীতি। বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানির দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কাজ আরও কঠিন হবে। ২৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি কমিটির বৈঠকেও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন এক কঠিন সমীকরণের মুখে। মূল্যস্ফীতি ঠেকাতে সুদের হার উঁচুতে রাখলে ঋণের খরচ বেশি থাকে। তাতে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যায়। উল্টো দিকে, বিনিয়োগে গতি ফেরাতে সুদ কমালে মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ পড়ার আশঙ্কা থাকে। এক দিকে বাঁচালে অন্য দিকে ক্ষতি, এমন পরিস্থিতিতে সহজ কোনো সমাধান নেই।
তৃতীয় ঝুঁকি বিনিয়োগ। উচ্চ সুদহার, দুর্বল ব্যাংক খাত ও ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা মিলে বিনিয়োগের গতি আটকে রেখেছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোর সমস্যা না মেটালে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ স্বাভাবিক করা কঠিন। ঋণ না পেলে শিল্প ও ব্যবসায় নতুন বিনিয়োগ হয় না, কর্মসংস্থানও বাড়ে না। আইএমএফ ব্যাংক খাত পুনর্গঠনকে জরুরি বলেছে। সংস্থার মতে, আর্থিক খাতের সংস্কার ও ব্যাংকগুলোর দুর্বলতা দূর না হলে টেকসই ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগ ফেরানো যাবে না।
আইএমএফের আরেকটি পর্যবেক্ষণ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সংস্থাটির মতে, এই তিন ঝুঁকি আলাদা নয়, একটি আরেকটিকে বাড়িয়ে তুলতে পারে। উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যায়। জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, ফলে মূল্যস্ফীতি চড়ে। মূল্যস্ফীতি ঠেকাতে সুদ উঁচু রাখতে হয়, ফলে বিনিয়োগ আটকে যায়। বিনিয়োগ না বাড়লে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান কমে, আয় কমে, আর চাহিদা দুর্বল হয়। এই দুর্বল অর্থনীতি আবার ব্যাংকের ঋণ আদায়ে চাপ ফেলে। অর্থাৎ ঝুঁকিগুলো একটি চক্র তৈরি করছে। কোনো একটি ঝুঁকি সামলালেই পুরো সমস্যা মিটবে না, তিনটি একসঙ্গে সামলানোর কৌশল লাগবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, আগে থেকেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে। এর মধ্যে জ্বালানির দাম বাড়ায় তা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁর মতে, এর প্রভাব শুধু পরিবহনে সীমিত থাকবে না। বিদ্যুৎ থেকে শুরু করে সব ধরনের উৎপাদন ব্যবস্থায় চাপ পড়বে এবং ব্যয় বাড়বে। পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির চাপ তৈরি হয়েছে, নিত্যপণ্যের দামও বাড়তে পারে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে জ্বালানির দাম বাড়ানো মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে বলে তিনি মনে করেন।
অর্থনীতিবিদ মাশরুর রিয়াজ বিনিয়োগের পথে তিনটি বাধা দেখছেন। জ্বালানি, মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগের পারস্পরিক সম্পর্ক এখন আরও স্পষ্ট বলে তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্য, জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়াতে হবে। এ দুটি খাত ঠিক না হলে নতুন বিনিয়োগ আসবে না, বিদ্যমান উদ্যোক্তারাও সম্প্রসারণে আগ্রহী হবেন না। জ্বালানি ও বিদ্যুতের সংকটে সক্ষমতা থাকার পরও কারখানাগুলো উৎপাদন ধরে রাখতে পারছে না। ফলে উদ্যোক্তাদের সম্প্রসারণ পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি দ্রুত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিয়েছেন। মূল্যস্ফীতি বেশি থাকলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে, বাজারে চাহিদা দুর্বল হয়, আর এমন অনিশ্চিত সময়ে নতুন বিনিয়োগে কেউ আগ্রহী হন না।
এই বিশ্লেষণের একটি বড় শিক্ষা হলো, সংকটের কারণ যতটা বাইরের, সমাধান ততটাই ভেতরের। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বা বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বাংলাদেশের হাতে নেই। কিন্তু বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা, ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং সুদের হার ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার কাজ দেশের নিজের হাতেই আছে। আইএমএফের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর পরামর্শের মূল কথাও এটিই। দেশে উৎপাদন ও সরবরাহ যত শক্ত হবে, বাইরের ধাক্কা তত কম লাগবে।
তবে এই পথ সহজ নয়। ব্যাংক খাতের সংস্কার সময়সাপেক্ষ। জ্বালানি সরবরাহ বাড়াতে বিদেশি মুদ্রা ও বিনিয়োগ দরকার, অথচ আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ আগে থেকেই বেড়েছে। ফলে সরকারের হাতে সীমিত সম্পদ দিয়ে অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে। প্রতিবেদনে সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ বা সময়সীমার কথা বলা হয়নি। উপদেষ্টার বৈঠকের কথা এলেও সেখানে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা জানা যায়নি। তাই ঝুঁকি মোকাবিলার পরিকল্পনা এখনো ঘোষণার স্তরে আছে বলা যায়।
সাধারণ মানুষের জন্য এর অর্থ পরিষ্কার। পরিবহন ভাড়া ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার চাপ সামনে আরও বাড়তে পারে। প্রবৃদ্ধি ধীর হলে নতুন চাকরির সুযোগও কম তৈরি হবে। বিশেষ করে তরুণ কর্মপ্রার্থীরা এর ধাক্কা বেশি পাবেন। আবার উচ্চ সুদের হার দীর্ঘায়িত হলে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ঋণের খরচ ভারী থাকবে।
সব মিলিয়ে অর্থনীতি এখন এক সংকটকালীন মোড়ে। পরের কয়েক মাসে তিনটি বিষয় নজরে রাখতে হবে। জ্বালানির দামের প্রভাবে মূল্যস্ফীতি কোন দিকে যায়, মুদ্রানীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়, আর ব্যাংক খাত সংস্কারে সরকার কতটা দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে পারে। এই তিনের উত্তরেই বোঝা যাবে, এডিবির কমানো ৪ শতাংশের পূর্বাভাস শেষ পর্যন্ত সঠিক থাকে, নাকি পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।

