বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে অগ্নিনিরাপত্তা সরঞ্জাম অনুমোদনের প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ইউরোপীয় মান অনুসরণ করা অগ্নি শনাক্তকরণ ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থা অনুমোদনে বেশি সময় লাগছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মান অনুসরণ করা কিছু সরঞ্জাম তুলনামূলক দ্রুত অনুমোদন পাচ্ছে—এমন অভিযোগ তুলেছে সংস্থাটি।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর তৈরি পোশাক খাতের স্থায়িত্ব কাউন্সিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল হকের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার এ বিষয়ে উদ্বেগ জানান।
চিঠিতে বলা হয়, ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান ও সদস্য দেশগুলো বাংলাদেশের বাজারে সম্ভাব্য বৈষম্যের বিষয়ে অভিযোগ করেছে। তাদের মতে, এর ফলে ইউরোপীয় সরবরাহকারীদের ব্যবসায়িক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিযোগ অনুযায়ী, ইউরোপীয় মানদণ্ড অনুসরণ করা অগ্নি শনাক্তকরণ ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থা অনুমোদনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত যাচাই এবং দীর্ঘ সময়ের মুখোমুখি হচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ড অনুসরণকারী কিছু ব্যবস্থা তুলনামূলক দ্রুত অনুমোদন পাচ্ছে।
তাদের দাবি, যেসব পোশাক কারখানা ইউরোপীয় মানের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা স্থাপনে বিনিয়োগ করেছে, সেগুলোর অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে কিছু কারখানা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় স্বীকৃতি পাচ্ছে না।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, কিছু কারখানা মালিক প্রতিযোগী দেশের সরবরাহকারীদের কাছ থেকে সরঞ্জাম নেওয়ার দিকে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতে, ইউরোপীয় ও যুক্তরাষ্ট্রের উভয় মানই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং উভয়ের মূল লক্ষ্য মানুষের জীবন নিরাপদ রাখা। তাই অনুমোদনের ক্ষেত্রে কোনো একটি মানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলে তা বাজারে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করতে পারে।
সংস্থাটি বলেছে, অনুমোদন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা, স্পষ্ট সময়সীমার অভাব এবং অনিশ্চয়তা বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভবিষ্যৎ বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা চলার সময় এই বিষয়টি সামনে এসেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাজারে স্বচ্ছতা, সমতা এবং নির্ভরযোগ্য অনুমোদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
তাদের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে ইউরোপীয় ও যুক্তরাষ্ট্রের উভয় নিরাপত্তা মানকে সমানভাবে বিবেচনা করা, অনুমোদন প্রক্রিয়ার স্পষ্ট নির্দেশনা প্রকাশ করা এবং সরবরাহকারী ও কারখানাগুলোর জন্য মতামত জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করা।
এই চিঠির অনুলিপি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি, বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি, শ্রমিক প্রতিনিধি এবং বড় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছেও পাঠানো হয়েছে।
তবে তৈরি পোশাক খাতের স্থায়িত্ব কাউন্সিল জানিয়েছে, তাদের কার্যক্রম স্বচ্ছতা, স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।
কাউন্সিলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের সরঞ্জাম ব্যবহারের সুপারিশ বা বাধ্যবাধকতা দেয় না। কোন ধরনের সরঞ্জাম ব্যবহার করা হবে, তা কারখানা মালিক ও তাদের কারিগরি বিশেষজ্ঞরা নির্ধারণ করেন।
কাউন্সিল জানিয়েছে, ইউরোপীয় বা যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো স্বীকৃত নিরাপত্তা মান অনুযায়ী পরীক্ষিত এবং অনুমোদিত তৃতীয় পক্ষের সনদ থাকা সরঞ্জাম গ্রহণ করা হয়।
তাদের তথ্য অনুযায়ী, কাউন্সিলের আওতাভুক্ত ১ হাজার ৯০০টির বেশি পোশাক কারখানায় বিশ্বের ৩২টি প্রতিষ্ঠানের তৈরি অগ্নি শনাক্তকরণ ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯টি প্রতিষ্ঠান ইউরোপভিত্তিক, ৭টি যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাভিত্তিক এবং ৬টি এশিয়ার।
কাউন্সিল জানিয়েছে, মোট ৬১টি সরঞ্জাম মডেল অনুমোদিত হয়েছে। এর মধ্যে ২৩টি ইউরোপীয় নিরাপত্তা মান এবং ৩৮টি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা মান অনুসরণ করে।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। কোনো সরঞ্জাম নির্ধারিত নিরাপত্তা মান পূরণ না করলে তা অনুমোদন দেওয়া হবে না।
একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের উত্থাপিত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করে সমাধানের জন্য বৈঠকে বসার আগ্রহ প্রকাশ করেছে কাউন্সিল।

