পোশাক খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির দিকে এগোতে চাইছে বাংলাদেশ। এই লক্ষ্য অর্জনে এবং দেশে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে এবার বিশ্বের তথ্যপ্রযুক্তির প্রাণকেন্দ্র সিলিকন ভ্যালির শীর্ষ প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে এক ঐতিহাসিক বৈঠকে বসেছে বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল। এই আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, সেমিকন্ডাক্টর এবং সাইবার সিকিউরিটির মতো অত্যাধুনিক খাতে কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলা এবং দেশে বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা।
গত সাতাশ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত ফোর সিজনস হোটেল সিলিকন ভ্যালিতে এই বিশেষ সিইও এবং সিনিয়র এক্সিকিউটিভ রাউন্ডটেবিল বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। লস অ্যাঞ্জেলেসে অবস্থিত বাংলাদেশের কনস্যুলেট জেনারেলের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির জন্য প্রযুক্তি বিনিয়োগ এবং কৌশলগত অংশীদারত্ব। দেশের অর্থনীতিকে পরবর্তী ধাপে নিয়ে যেতে হলে সস্তা শ্রমের বদলে উচ্চ মূল্যের প্রযুক্তি পণ্য উৎপাদনের কোনো বিকল্প নেই। আর এই কারণেই ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ভেঞ্চার ক্যাপিটাল খাতের প্রসার ঘটাতে মার্কিন নীতিনির্ধারক ও সিলিকন ভ্যালির জায়ান্টদের দ্বারস্থ হয়েছে বাংলাদেশ।
সিলিকন ভ্যালির রাডার কি এবার ঢাকার দিকে ঘুরছে
বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাত ও মানবসম্পদের বিশাল সম্ভাবনা বিদেশীদের সামনে তুলে ধরতে এই বৈঠকে নেতৃত্ব দেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা এ এইচ এম রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তার সঙ্গে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি দলে আরও উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এবং প্রধানমন্ত্রীর ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। এছাড়া লস অ্যাঞ্জেলেসে নিযুক্ত বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল কাজী মোহাম্মদ জাবেদ ইকবাল এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত থেকে দেশের বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও নীতিমালার কথা তুলে ধরেন।
রাউন্ডটেবিল বৈঠকটিতে বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ নির্বাহীরা অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেন। পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কারম্যাক্স কোম্পানির এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং চিফ ইনফরমেশন অ্যান্ড টেকনোলজি অফিসার শামীম মোহাম্মদ। বৈঠকে অংশগ্রহণকারী হেভিওয়েট অতিথিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন রিপ্লিট কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও আমজাদ মাসাদ, জেডস্কেলারের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও সিইও জয় চৌধুরী এবং ইন্টেল ও মেডট্রনিকের সাবেক চেয়ারম্যান ডক্টর ওমর ইশরাক। তাদের উপস্থিতিতেই মার্কিন এআই এবং সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের প্রাথমিক আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।
ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে টিকতে হলে যে পথে হাঁটতে হবে
ভবিষ্যৎ পৃথিবীর অর্থনীতির চাকা ঘুরবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই এবং সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের ওপর ভর করে। বৈশ্বিক পরিসংখ্যান বলছে চলতি দশকের শেষ নাগাদ বিশ্বব্যাপী শুধু এআই অবকাঠামো খাতেই তিন থেকে চার ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ হতে যাচ্ছে। এই বিশাল বাজারের অতি ক্ষুদ্র একটি অংশও যদি বাংলাদেশ নিজেদের দিকে টানতে পারে তবে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক চিত্র পুরোপুরি বদলে যাবে। এজন্যই আলোচনাটিতে সেমিকন্ডাক্টর নকশা ও উৎপাদন, মহাকাশ প্রযুক্তি, পৃথিবী পর্যবেক্ষণ এবং অ্যাডভান্সড ম্যানুফ্যাকচারিং বা উন্নত উৎপাদন খাতের মতো বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।
প্রযুক্তি খাতে শুধু বৈদেশিক বিনিয়োগ আনলেই হবে না, বরং সেই প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের জন্য দক্ষ জনবলও গড়ে তুলতে হবে। এ বিষয়টি মাথায় রেখেই সিলিকন ভ্যালির বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন এবং হেলথকেয়ার টেকনোলজি বা স্বাস্থ্যসেবা প্রযুক্তি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। এছাড়া দেশীয় স্টার্টআপগুলোকে বৈশ্বিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কীভাবে যৌথভাবে কাজ করা যায় তার রূপরেখাও খোঁজা হয়েছে। দেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে পাস করা তরুণ মেধাবীদের আন্তর্জাতিক মানের কাজের সুযোগ তৈরি করতে এই ধরনের বৈশ্বিক অংশীদারত্বের অত্যন্ত প্রয়োজন রয়েছে।
সব মিলিয়ে সিলিকন ভ্যালির শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে বাংলাদেশের এই আলোচনা দেশের প্রযুক্তিগত বিবর্তনের পথে একটি বিশাল মাইলফলক হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে শুধু বৈঠক বা আলোচনাতেই রাতারাতি বিনিয়োগ আসবে না, এর জন্য দেশে একটি স্থিতিশীল ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর সঠিক উন্নয়ন ঘটিয়ে যদি বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করা যায় তবে অচিরেই বাংলাদেশ এশিয়ার অন্যতম প্রধান প্রযুক্তি হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হবে।

