বাংলাদেশের বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খলে (জিভিসি) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে উঠে এসেছে চীন। রপ্তানি শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে দেশটির অবদান এখন বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে বড় ভূমিকা রাখছে।
জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের তৈরি আঞ্চলিক সংযুক্তি ও মূল্য শৃঙ্খল বিশ্লেষণ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের মোট রপ্তানিতে বিদেশি মূল্য সংযোজনের পরিমাণ ছিল ৮ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রপ্তানির ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ।
এর মধ্যে শুধু চীন থেকেই এসেছে ৩ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারের মূল্য সংযোজন। অর্থাৎ বাংলাদেশের রপ্তানিতে ব্যবহৃত বিদেশি উপকরণের প্রায় ৪৬ শতাংশের উৎস ছিল চীন।
২০২৪ সালে বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি ছিল ৪৪ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে চীনা উপকরণের অবদান ছিল মোট রপ্তানির ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ।
অর্থাৎ বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের পেছনে বিদেশি কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্য সরবরাহকারী দেশ হিসেবে চীন সবচেয়ে বড় অংশীদার।
চীনের পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারত। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের রপ্তানিতে বিদেশি মূল্য সংযোজনের ক্ষেত্রে ভারতের অবদান ছিল ১১ দশমিক ৬০ শতাংশ। এর আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ৯৪ কোটি ডলার।
গত এক দশকে বাংলাদেশের বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খলে অংশগ্রহণ মূলত বিদেশি উপকরণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে।২০১৫ সালে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ১৪ দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যে বিদেশি মূল্য সংযোজন ছিল। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ দশমিক ৭ শতাংশে।
অন্যদিকে দেশের নিজস্ব মূল্য সংযোজনের অংশ ২০১৫ সালের ১০ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে সামান্য কমে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ২০২৫ সালের বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন বিশ্বের অন্যতম বড় মূল্য শৃঙ্খল অংশগ্রহণকারী দেশ। ২০২৪ সালে বৈশ্বিক রপ্তানিতে দেশীয় মূল্য সংযোজনের ক্ষেত্রে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানি শীর্ষ অবস্থানে ছিল।
অন্যদিকে বাংলাদেশকে বিশ্বের অপেক্ষাকৃত কম মূল্য শৃঙ্খল সংযুক্ত দেশগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পে চীনের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে পোশাক ও বস্ত্র খাতে ব্যবহৃত চীনা উপকরণের প্রায় ৯৫ শতাংশ এই খাতের রপ্তানি মূল্যের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের প্রায় ৬০ শতাংশ হলো তুলা, কাপড় ও আঁশজাতীয় উপকরণ।
২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খলের বিদেশি সংযোগের প্রায় ৮৫ শতাংশ এসেছে বস্ত্র ও পোশাক খাত থেকে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, চীনা কাপড় ও অন্যান্য কাঁচামাল দামের পাশাপাশি মানের দিক থেকেও প্রতিযোগিতামূলক। এ কারণে সমুদ্রপথে চীন থেকে পণ্য আনতে সময় লাগলেও বিকল্প উৎস খুঁজে পাওয়া কঠিন।
বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক বলেন, চীন থেকে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে দাম ও মান—দুই ধরনের সুবিধাই পাওয়া যায়।
তার মতে, অনেক ক্ষেত্রে চীনা পণ্যের দাম সবচেয়ে কম না হলেও মান ও প্রতিযোগিতামূলক মূল্যের কারণে ব্যবসায়ীরা সেগুলো বেছে নেন।
তিনি বলেন, আগে চীন থেকে সিঙ্গাপুর ও কলম্বো হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য আসতে প্রায় তিন সপ্তাহ সময় লাগত। বর্তমানে সরাসরি পথে অনেক পণ্য আসায় সময় প্রায় এক সপ্তাহ কমেছে।
শুধু কাঁচামাল নয়, বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগও বাড়ছে।২০২৫ সালে বাংলাদেশে চীনের সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ ছিল ৩২১ দশমিক ১৫ মিলিয়ন ডলার। ওই বছর বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস ছিল চীন।
২০২৫ সালের শেষে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের মোট স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার।
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে চীনা বিনিয়োগ বাড়লে বাংলাদেশের বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ আরও শক্তিশালী হতে পারে।
যদিও বাংলাদেশের উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যবস্থায় চীনের ভূমিকা বড়, চীনের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো তুলনামূলক কম।
বাংলাদেশের বার্ষিক পণ্য রপ্তানি চীনে এখনো ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়নি। চীনের সঙ্গে মোট বাণিজ্যের মাত্র প্রায় ৩ দশমিক ৫০ শতাংশ আসে বাংলাদেশের রপ্তানি থেকে।
তথ্য অনুযায়ী, চীনের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিতে বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খলের অংশও কমছে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশের চীনে রপ্তানির প্রায় ৪৬ শতাংশ মূল্য শৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত ছিল, যা ২০২৪ সালে কমে ৩১ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে।
অন্যদিকে চীন থেকে বাংলাদেশের আমদানি গত বছর ২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো শুধু কাঁচামাল আমদানির ওপর নির্ভর না করে নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো। পাশাপাশি চীনের বাজারে রপ্তানি বাড়াতে নতুন পণ্য ও সেবা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
কারণ বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খলে যুক্ত থাকার পাশাপাশি স্থানীয় মূল্য সংযোজন বাড়াতে পারলেই বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে আরও শক্তিশালী রপ্তানি অবস্থান তৈরি করতে পারবে।

