বাংলাদেশে প্লাস্টিক বর্জ্যকে শুধু পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে না দেখে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার উৎস হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন বর্ধিত উৎপাদক দায়বদ্ধতা নীতিমালার আওতায় প্লাস্টিক সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি কাজ করতে পারলে প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে অতিরিক্ত সংগ্রহের বিনিময়ে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি এবং স্ট্যাক ফাউন্ডেশনের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘প্লাস্টিক ক্রেডিট: বাংলাদেশের বর্জ্য ও বিশ্বের মুদ্রা’ শীর্ষক কর্মশালায় বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন।
তাদের মতে, প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন একদিকে পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখবে, অন্যদিকে পুনর্ব্যবহার শিল্পকে নতুন ব্যবসায়িক খাতে পরিণত করতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে উচ্চমানের তথ্য সংরক্ষণ, কঠোর যাচাই প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণের সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
স্ট্যাক ফাউন্ডেশনের টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ তাজিন মাহমুদ আশিক বলেন, নতুন বর্ধিত উৎপাদক দায়বদ্ধতা নীতিমালার আওতায় উৎপাদক, আমদানিকারক, ব্র্যান্ড মালিক, সুপারশপসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজারে ছাড়া প্লাস্টিকের একটি অংশ সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার করার দায়িত্ব নিতে হবে।
তিনি জানান, প্রথম দুই বছরে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎপাদিত বা বাজারজাত করা প্লাস্টিকের ১৫ শতাংশ সংগ্রহ এবং ৭ দশমিক ৫ শতাংশ পুনর্ব্যবহার করতে হবে। পরবর্তী সময়ে এই লক্ষ্য বেড়ে সংগ্রহের ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ এবং পুনর্ব্যবহারের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশে উন্নীত হবে।
বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৮ লাখ থেকে ৮ লাখ ২৫ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়। এর মধ্যে প্রায় ৬৩ শতাংশ বর্জ্য সংগ্রহের বাইরে থেকে যায় বলে কর্মশালায় জানানো হয়।
তবে এই বড় চ্যালেঞ্জকেই নতুন ব্যবসার সুযোগ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাজিন মাহমুদ আশিক বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি প্লাস্টিক সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার করতে পারলে অতিরিক্ত অংশ আন্তর্জাতিক বাজারে প্লাস্টিক ক্রেডিট হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
প্লাস্টিক ক্রেডিট হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে নির্দিষ্ট পরিমাণ প্লাস্টিক সংগ্রহ বা পুনর্ব্যবহারের স্বীকৃতি হিসেবে প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক মূল্য পেতে পারে।
তবে শুধু প্লাস্টিক সংগ্রহ করলেই এই সুবিধা পাওয়া যায় না। এর জন্য প্রয়োজন সঠিক তথ্য সংরক্ষণ, প্রাথমিক বিশ্লেষণ, যাচাই এবং অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিরীক্ষা।
প্লাস্টিক ক্রেডিট সনদ বিশেষজ্ঞ জিশান মোহসেন বলেন, আন্তর্জাতিক সনদ পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় চ্যালেঞ্জ হলো তথ্য সংরক্ষণ ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র তৈরি করা।
তার মতে, অনেক প্রতিষ্ঠান বর্জ্য সংগ্রহের কার্যক্রম চালালেও আন্তর্জাতিক মানের সনদের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রমাণ সংরক্ষণ করে না।
তিনি আরও বলেন, সনদ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় একাধিকবার নিরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে, যা ব্যয়বহুল। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে ভালো মানের প্লাস্টিক ক্রেডিটের মূল্য প্রতি টনে কয়েকশ ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
তিনি বলেন, এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অতিরিক্ত সংগ্রহ বা পুনর্ব্যবহার। অর্থাৎ কোনো প্রতিষ্ঠান আইনগতভাবে যতটুকু করতে বাধ্য, তার চেয়ে বেশি কাজ করলেই সেই বাড়তি অংশের মূল্য তৈরি হয়।
আরএফএল গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ কামরুল হাসান জানান, বাংলাদেশে প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার কেন্দ্র স্থাপনের পর প্রাণ ২০২৪ সালে প্রথম প্লাস্টিক ক্রেডিট সনদের জন্য আবেদন করে।
প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক ৩০ হাজার টন প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারের সক্ষমতা রয়েছে। সনদ পাওয়ার জন্য তিন দফা নিরীক্ষা এবং বিপুল পরিমাণ তথ্য জমা দিতে হয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি নিবন্ধন পেয়েছে, তবে এখনো কোনো প্লাস্টিক ক্রেডিট পায়নি।
কামরুল হাসান বলেন, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন পণ্যের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ও দায়িত্বশীল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই রপ্তানিকারকদের জন্য প্লাস্টিক ক্রেডিট সনদ ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশ প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি শামীম আহমেদ বলেন, বর্জ্যকে নতুন অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করার সুযোগ রয়েছে।
তার মতে, শুধু প্রচলিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে পুনর্ব্যবহার ও পুনরায় ব্যবহারের অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে নতুন ব্যবসা গড়ে তোলা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন হলে পরিবেশ দূষণ কমানোর পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান, রপ্তানি সুযোগ এবং পুনর্ব্যবহার শিল্পের বিকাশ ঘটতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা।

