আয়কর রিটার্ন দাখিলের মৌসুম এলেই সাধারণ করদাতাদের মধ্যে নানা ধরনের বিভ্রান্তি ও প্রশ্ন দেখা দেয়। কারা রিটার্ন জমা দেবেন, কাদের জন্য এটি ঐচ্ছিক, দেরিতে জমা দিলে কী ধরনের জরিমানা গুনতে হবে, কিংবা রিটার্নে ভুল হলে কীভাবে সংশোধন করা যাবে; এসব বিষয় নিয়ে অনেকেই স্পষ্ট ধারণা রাখেন না।
এমনকি রিটার্ন জমা দেওয়ার পর প্রাপ্তি স্বীকারপত্র বা অ্যাকনলেজমেন্ট স্লিপ হাতে পেলেই যে আইনি দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, এই সত্যটিও অনেকের অজানা। সম্প্রতি আর্থিক খাতের বিশ্লেষক ও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (এফসিএ) ফয়সাল ইসলামের এক বিস্তারিত বিশ্লেষণে নতুন আয়কর আইনের (২০২৩) আলোকে এসব বিভ্রান্তির আইনি ব্যাখ্যা ও করদাতাদের করণীয় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা উঠে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একজন করদাতার জন্য শুধুমাত্র যেকোনোভাবে একটি রিটার্ন দাখিল করাই যথেষ্ট নয়। বরং সঠিক ব্যক্তি হিসেবে সঠিক সময়ে, যথাযথ ফর্মে এবং সব প্রমাণাদিসহ পূর্ণাঙ্গ রিটার্ন দাখিল করাটাই আইনের মূল দাবি।
কাদের জন্য রিটার্ন বাধ্যতামূলক এবং কারা পাবেন অব্যাহতি
আয়কর আইনের ১৬৬ ধারা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কোনো ব্যক্তির আয় যদি করমুক্ত সীমা অতিক্রম করে, তবে তার জন্য রিটার্ন দাখিল করা বাধ্যতামূলক। শুধু তাই নয়, গত তিন বছরের মধ্যে যদি কোনো বছর কারও কর নির্ধারণ হয়ে থাকে, তাহলেও তাকে রিটার্ন দিতে হবে।
আয়ের পরিমাণ যাই হোক না কেন; কোম্পানির পরিচালক, ফার্মের অংশীদার, ব্যবসায়িক নির্বাহী, সরকারি কর্মচারী এবং বাংলাদেশে স্থায়ী স্থাপনা রয়েছে এমন অনিবাসী ব্যক্তিদের জন্য রিটার্ন দেওয়া বাধ্যতামূলক।
তবে আইনে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানকে এই বাধ্যবাধকতার বাইরে রাখা হয়েছে।
ফয়সাল ইসলামের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলা মাধ্যমে পাঠদানকারী প্রাথমিক, প্রাক্-প্রাথমিক, সরকারি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (যদি ইংরেজি ভার্সন না থাকে) রিটার্ন জমার আওতামুক্ত থাকবে। এছাড়া সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিটিআরসি, বিএসইসি এবং সরকারি অনুদানে পরিচালিত অবাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, এতিমখানা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও এই অব্যাহতির তালিকায় রয়েছে।
অনলাইনে দাখিল বাধ্যতামূলক, তবে বিশেষ ক্ষেত্রে ছাড়
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সম্প্রতি স্বাভাবিক ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য অনলাইনে ই-রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করেছে।
তবে বিশ্লেষকরা জানাচ্ছেন, এই নিয়মেও কিছু ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রবীণ করদাতা, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা শারীরিকভাবে অসমর্থ ব্যক্তি, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি এবং মৃত করদাতার আইনি প্রতিনিধিরা চাইলে অনলাইনে না দিয়ে আগের মতো কাগজে (পেপার রিটার্ন) জমা দিতে পারবেন।
এছাড়া অনলাইনে নিবন্ধনে প্রযুক্তিগত সমস্যা হলে কর কমিশনারের অনুমোদন সাপেক্ষে পেপার রিটার্ন দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। সাধারণ ব্যক্তি ছাড়া অন্যান্য সত্তাকে (কোম্পানি বা ফার্ম) আইনের ১৬৯ ধারা অনুযায়ী নির্দিষ্ট ফর্ম, পরিশিষ্ট ও নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীসহ রিটার্ন জমা দিতে হয়।
সময়ে জমা দিলে ছাড়, দেরিতে জরিমানার খড়গ
নতুন আয়কর আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সময়মতো রিটার্ন জমায় উৎসাহ প্রদান এবং দেরিতে জরিমানা আদায়। ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দাখিলকারী ব্যক্তি করদাতারা তাদের পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ (সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত) কর রেয়াত বা ছাড় পাবেন। ১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত জমা দিলে কোনো ছাড় পাওয়া যাবে না, তবে জরিমানাও হবে না।
কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে রিটার্ন দিলে পরিশোধযোগ্য করের ২ শতাংশ বা ৩ হাজার টাকার মধ্যে যেটি বেশি, তা জরিমানা হিসেবে দিতে হবে। ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুনের মধ্যে দিলে এই জরিমানার পরিমাণ বেড়ে ৫ শতাংশ বা ৫ হাজার টাকায় দাঁড়াবে।
এছাড়া করবর্ষ পার হওয়ার পর উপ-কর কমিশনারের নোটিশ পেয়ে বিলম্ব রিটার্ন দিলে পরিশোধযোগ্য করের ১৫ শতাংশ বা ১০ হাজার টাকা (যেটি বেশি) জরিমানা গুনতে হবে এবং অনেক ক্ষেত্রে কর অব্যাহতির সুবিধাও বাতিল হয়ে যেতে পারে।
ভুল সংশোধন ও অসম্পূর্ণ রিটার্নের আইনি ঝুঁকি
রিটার্ন জমার পর ভুল ধরা পড়লে আইনের ১৭৫ ধারা অনুযায়ী ১৮০ দিনের মধ্যে সংশোধিত রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে ফয়সাল ইসলাম তার বিশ্লেষণে সতর্ক করে জানিয়েছেন, এই সুযোগের অপব্যবহার করা যাবে না। সংশোধিত রিটার্ন দিয়ে কোনোভাবেই মূল রিটার্নে দেখানো করের পরিমাণ কমানো যাবে না এবং উপযুক্ত দালিলিক প্রমাণ ছাড়া আয় বা সম্পদের তথ্য পরিবর্তন করা যাবে না।
সবচেয়ে বড় ভুলের জায়গাটি হলো ‘প্রাপ্তি স্বীকারপত্র’ বা স্লিপ পাওয়াকে চূড়ান্ত মনে করা। ১৭৬ ধারা অনুযায়ী, দাখিল করা রিটার্নে যদি প্রয়োজনীয় তথ্য বা দলিলের ঘাটতি থাকে, তবে উপ-কর কমিশনার নোটিশ পাঠাতে পারেন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেই নোটিশের জবাব বা ঘাটতি পূরণ না করলে ওই রিটার্নটি পুরোপুরি বাতিল বা অকার্যকর হিসেবে গণ্য হতে পারে। অর্থাৎ, আইনের চোখে ধরে নেওয়া হবে যে করদাতা রিটার্ন জমা দেননি।
সার্বিকভাবে, আয়কর রিটার্ন প্রক্রিয়া এখন কেবল একটি দাপ্তরিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর আইনি বিষয়। বিশ্লেষকদের পরামর্শ হলো, নোটিশ এড়িয়ে না গিয়ে নির্ধারিত সময়ে সঠিক তথ্য ও প্রমাণাদিসহ রিটার্ন জমা দেওয়া এবং কর সংক্রান্ত যেকোনো জটিলতায় প্রয়োজনে পেশাদারদের সহায়তা নেওয়াই করদাতাদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পদক্ষেপ।

