যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালিভিত্তিক উদ্ভাবন প্ল্যাটফর্ম প্লাগ অ্যান্ড প্লে বাংলাদেশে ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি বিদেশি বিনিয়োগ আনার সম্ভাব্য সুযোগ চিহ্নিত করেছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ টেক সেন্টার ও এআই সেন্টার অব এক্সিলেন্স প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন উদ্যোগে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজের প্রস্তাব দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এই অঙ্ক এখনো নিশ্চিত বিনিয়োগ নয়। প্রাথমিক পর্যায়ে সম্ভাব্য বিনিয়োগ ও প্রকল্পের সুযোগ নিয়েই আলোচনা হয়েছে, কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি। শিরোনামের সংখ্যাটি তাই সম্ভাবনার হিসাব হিসেবেই পড়তে হবে।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর সিলিকন ভ্যালিতে প্লাগ অ্যান্ড প্লের সদর দপ্তরে প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্বের সঙ্গে বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের বৈঠক হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ সরকার ও প্লাগ অ্যান্ড প্লের মধ্যে সহযোগিতার লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারকও সই হয়। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বৈঠক শেষে গত রাতে প্রথম আলোকে এসব তথ্য জানান। তাঁর ভাষ্য, যে যোগাযোগ হয়েছে তা এগিয়ে নিতে পারলে বাংলাদেশ লাভবান হবে। প্লাগ অ্যান্ড প্লের গুরুত্ব বোঝাতে তিনি বলেন, পেপ্যাল তারা তৈরি করেছে এবং গুগলের যাত্রাও শুরু হয়েছিল এই প্রতিষ্ঠানের অফিস থেকে। এই উদাহরণ প্রতিষ্ঠানটির নেটওয়ার্কের শক্তি বোঝায়, তবে অতীত সাফল্য বাংলাদেশে বিনিয়োগ আসার নিশ্চয়তা নয়। সমঝোতা স্মারকের শর্ত ও বাধ্যবাধকতা কী, তা প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়নি।
আলোচনায় বিদেশি বিনিয়োগ আনা, স্টার্টআপ ও উদ্ভাবন খাত শক্তিশালী করা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সক্ষমতা ও প্রযুক্তি দক্ষতা বাড়ানো এবং বৈশ্বিক কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ তৈরির বিষয় উঠে আসে। বৈঠকের পর প্লাগ অ্যান্ড প্লে বাংলাদেশকে কৌশলগত অংশীদারত্বের প্রস্তাব দেয়। প্রতিষ্ঠানটির আন্তর্জাতিক করপোরেশন, বিনিয়োগকারী, স্টার্টআপ ও উদ্ভাবন অংশীদারদের নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে ৫০ কোটি ডলারের বেশি বিদেশি বিনিয়োগ আনার সম্ভাব্য উপায় নিয়ে কথা হয়। প্রস্তাবে দক্ষ প্রযুক্তি জনশক্তি, বিশ্ববিদ্যালয়, হাইটেক পার্ক, শিল্প সক্ষমতা এবং বড় ও ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ বাজারকে বিনিয়োগ আকর্ষণের ভিত্তি বলা হয়েছে।
প্রস্তাবের কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশ টেক সেন্টার ও এআই সেন্টার অব এক্সিলেন্স গড়ে তোলা। এসব কেন্দ্রের মাধ্যমে দেশের স্টার্টআপ, বিশ্ববিদ্যালয় ও দক্ষ জনশক্তিকে বৈশ্বিক করপোরেট ও বিনিয়োগ নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এখানে বিনিয়োগের চেয়েও বড় সুযোগ হতে পারে সংযোগ। স্থানীয় স্টার্টআপগুলো বৈশ্বিক বাজার ও অর্থায়নের নাগালে এলে তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। কেন্দ্রগুলো কোথায় হবে, কে অর্থ দেবে এবং কবে নাগাদ চালু হবে, এসব তথ্য এখনো জানা যায়নি।
সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভোক্তা ইলেকট্রনিকস, হালকা প্রকৌশল, ওষুধশিল্প, উন্নত উৎপাদন এবং সেমিকন্ডাক্টর পরীক্ষা ও প্যাকেজিং। এ ছাড়া স্টার্টআপ ও ভেঞ্চার অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক করপোরেট অংশীদারত্ব, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প সহযোগিতা এবং বহুজাতিক প্রযুক্তি ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশে আনার উপায়ও প্রস্তাবে আছে। তালিকায় সেমিকন্ডাক্টর পরীক্ষা ও প্যাকেজিংয়ের উপস্থিতি লক্ষণীয়। এটি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের নতুন ভূমিকার সম্ভাবনা দেখায়, তবে এ খাতে সফল হতে হলে মানসম্মত অবকাঠামো, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ এবং বিশেষায়িত দক্ষতা লাগে। এসব প্রস্তুতি নিয়ে প্রতিবেদনে কিছু বলা হয়নি।
বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে। একই সঙ্গে আলোচনাকে শুধু সমঝোতা ও সম্ভাবনায় সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব ও বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর প্রকল্পে রূপ দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছে। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে বিনিয়োগ, মানসম্মত কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও রপ্তানির সুযোগ তৈরি এবং বৈশ্বিক প্রযুক্তি মূল্যশৃঙ্খলে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। সমঝোতা স্মারক থেকে বাস্তব প্রকল্পে পৌঁছানোই সাধারণত সবচেয়ে কঠিন ধাপ। এ কারণেই প্রতিনিধিদলের এই জোর গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিনিধিদলে ছিলেন পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। বৈঠকে অংশ নেন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক মো. আরিফুল ইসলাম এবং লস অ্যাঞ্জেলেসে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল কাজী মুহাম্মদ জাবেদ ইকবাল। লস অ্যাঞ্জেলেসের কনস্যুলেট জেনারেল প্লাগ অ্যান্ড প্লে, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও অন্য অংশীজনের সঙ্গে পরবর্তী যোগাযোগ সমন্বয় করবে। প্রতিনিধিদলে তথ্যপ্রযুক্তি, অর্থ, পররাষ্ট্র ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট নেতৃত্বের উপস্থিতি দেখায়, বিষয়টিকে সরকার বহুমুখী গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে কোন সংস্থা প্রকল্পগুলোর নেতৃত্ব দেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সব মিলিয়ে ৫০ কোটি ডলারের অঙ্কটি সম্ভাব্য সুযোগের হিসাব, নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি নয়। পরবর্তী আলোচনা, যাচাই-বাছাই, অর্থায়নের ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় অনুমোদনের ভিত্তিতেই বিনিয়োগ ও প্রকল্প চূড়ান্ত হবে। তাই এখন নজর থাকবে তিনটি বিষয়ে: সমঝোতা স্মারক কত দ্রুত সুনির্দিষ্ট প্রকল্পে রূপ নেয়, টেক সেন্টার ও এআই সেন্টারের কাজ কবে শুরু হয়, এবং কোন খাতে প্রথম বাস্তব বিনিয়োগ আসে।

