দেশের বৈদ্যুতিক তার বা কেবল শিল্প বর্তমানে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। নির্মাণকাজের ধীরগতি, সরকারি প্রকল্পে বিলম্ব এবং শিল্প খাতে বিনিয়োগ কমে যাওয়ার কারণে এই খাতে চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় বর্তমানে কেবল বিক্রি ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ধীরগতি, সরকারি ক্রয় কমে যাওয়া, আবাসন খাতের স্থবিরতা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, ঋণপত্র খোলায় জটিলতা এবং ডলারের সংকট—সব মিলিয়ে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বিআরবি কেবলের বিপণন ও বিক্রয় বিভাগের পরিচালক রফিকুল ইসলাম রনি বলেন, সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম কমে যাওয়ার প্রভাব সরাসরি কেবল শিল্পে পড়েছে। সরকারি প্রকল্প, শিল্পায়ন এবং আবাসন খাত এই শিল্পের বড় বাজার হলেও বর্তমানে এসব খাতে গতি কমে গেছে।
তিনি জানান, বিআরবি কেবলের বিক্রি ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কমেছে। দেশের কেবল বাজারের বড় অংশ এই প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণে থাকায় সামগ্রিক বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে।
বাংলাদেশ ইলেকট্রিক্যাল কেবল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আখতার হোসেন ধালী বলেন, ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে। চাহিদা কমার পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এবং কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি তাদের টিকে থাকা কঠিন করে তুলেছে।
তিনি বলেন, মাত্র চার দিনের ব্যবধানে তামার দাম প্রতি কেজিতে ২৫০ টাকা বেড়েছে, যা উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিবিএস কেবলের এক কর্মকর্তা জানান, আগের মতো বাজারে গতি নেই। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানগুলো এখন টিকে থাকার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
শিল্প উদ্যোক্তারা মনে করছেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ব্যাংকিং সুবিধা বৃদ্ধি এবং বন্ধ হয়ে থাকা প্রকল্পগুলো পুনরায় চালু হলে আগামী বছরে বাজারে কিছুটা গতি ফিরতে পারে।
বর্তমানে দেশের কেবল বাজারের আকার প্রায় ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা। দুই দশক আগে যেখানে এই বাজার ছিল মাত্র ১ হাজার থেকে ২ হাজার কোটি টাকার মধ্যে।
দেশের স্থানীয় উৎপাদকরা মোট চাহিদার প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ পূরণ করছে। বাকি অংশ আমদানির মাধ্যমে আসে।
এই খাতে বর্তমানে শতাধিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং প্রায় ৫০ হাজার মানুষ সরাসরি কর্মরত। বিআরবি, প্রান-আরএফএলের বিজলি, বিবিএস, ওয়ালটন, প্যারাডাইস, পলি, পারটেক্স, আরআর এবং আকিজ বশির কেবলসসহ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।
এর পাশাপাশি বাংলাদেশ কেবল শিল্প লিমিটেড, ইস্টার্ন কেবলস এবং গাজী ওয়্যারসের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানও এই খাতে রয়েছে।
মন্দার আগে কেবল শিল্পে ভালো সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে চলতি বছরের জানুয়ারিতে আকিজ বশির গ্রুপ ৩০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করে আকিজ বশির কেবলস প্রতিষ্ঠা করে। প্রতিষ্ঠানটি শ্রীপুর ও গাজীপুরের কারখানা আধুনিকায়ন করেছে।
কারখানাটিতে বছরে প্রায় ৩০০ টন তামার কেবল এবং ২০০ টন পিভিসি প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা রয়েছে। এতে প্রায় ৫০০ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান হয়েছে।
তবে শিল্পের বড় সমস্যা হিসেবে কাঁচামালের ওপর আমদানিনির্ভরতাকে দেখছেন উদ্যোক্তারা। তামা, অ্যালুমিনিয়াম, প্লাস্টিক ও ফাইবারের প্রায় সবই বিদেশ থেকে আনতে হয়। এসব কাঁচামালের ওপর প্রায় ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক ও কর দিতে হয়।
নির্মাতাদের অভিযোগ, কিছু আমদানিকারক মূলধনী যন্ত্রপাতির নামে কম শুল্কে তৈরি কেবল আমদানি করছেন, যা স্থানীয় উৎপাদকদের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করছে।
তাদের আরও অভিযোগ, দেশের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অনেক সরকারি প্রকল্পে বিদেশি কেবল ব্যবহার করা হচ্ছে।
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, স্থানীয় শিল্পকে এগিয়ে নিতে হলে আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং নীতিগত সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন।
কেবল শিল্পের সঙ্গে নিরাপত্তার বিষয়টিও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিম্নমানের কেবল ব্যবহার অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে দেশে ২৭ হাজার ৫৯টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ৯ হাজার ৩৯২টি বা ৩৪ দশমিক ৭১ শতাংশ ঘটেছে বৈদ্যুতিক ত্রুটির কারণে।
বৈদ্যুতিক আগুনে ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৩২৩ কোটি টাকার বেশি।
রফিকুল ইসলাম রনি বলেন, নিম্নমানের কেবল আমদানি ও উৎপাদন বন্ধে দীর্ঘদিন ধরে কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়ে আসছেন তারা।
তার মতে, নিরাপদ ও মানসম্পন্ন কেবল ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো এখন জরুরি।
আখতার হোসেন ধালী বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে স্থানীয় উৎপাদকরা আমদানির বাকি ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বাজারও পূরণ করতে সক্ষম।
নির্মাণ, বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ ও শিল্প খাতে গতি ফিরে এলে এবং নিরাপদ ও উন্নতমানের কেবলের ব্যবহার বাড়লে দেশের কেবল শিল্প আবারও শক্তিশালী অবস্থানে ফিরতে পারে বলে আশা করছেন উদ্যোক্তারা।

