বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক কর্মী বিদেশে গেলেও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ কর্মী তৈরিতে এখনো বড় ঘাটতি রয়েছে। বিদেশগামী কর্মীদের প্রায় ৭১ শতাংশেরই কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই। ফলে দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়লেও বাংলাদেশ এখনো আধাদক্ষ ও স্বল্প দক্ষ শ্রমিক পাঠানোর ওপর বেশি নির্ভরশীল।
গবেষণা ও সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে যাওয়া কর্মীদের বড় অংশ সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র বা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ না নিয়েই বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। চট্টগ্রামে আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ না থাকা কর্মীর হার ৯২ শতাংশ, রাজশাহী ও রংপুরে ৮৪ শতাংশ এবং ঢাকায় ৮৩ শতাংশ।
অভিবাসন কর্মীদের সাধারণত পেশাজীবী, দক্ষ, আধাদক্ষ ও স্বল্প দক্ষ—এই চার শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, নার্স, কম্পিউটার অপারেটরসহ উচ্চ যোগ্যতার পেশাগুলো পেশাজীবী হিসেবে বিবেচিত হয়। অন্যদিকে মেকানিক, ওয়েল্ডার, ইলেকট্রিশিয়ান, চালক, পাচক, প্লাম্বারসহ নির্দিষ্ট কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীরা দক্ষ কর্মী হিসেবে বিবেচিত হন।
কিন্তু বাংলাদেশের বিদেশগামী শ্রমবাজার এখনো মূলত আধাদক্ষ ও স্বল্প দক্ষ কর্মীনির্ভর। গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিদেশে যাওয়া কর্মীদের মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ ছিলেন পেশাজীবী। দক্ষ কর্মীর সংখ্যা ছিল ২০ থেকে ২২ শতাংশ, আর ৭০ থেকে ৭৪ শতাংশ কর্মী ছিলেন আধাদক্ষ বা স্বল্প দক্ষ।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি), আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিদেশে যাওয়া কর্মীদের প্রায় ৮৭ শতাংশ কোনো সরকারি বা বেসরকারি প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে ৭১ শতাংশের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছিল না।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে ভর্তি হওয়া অনেকের মূল উদ্দেশ্য সরাসরি বিদেশে চাকরি পাওয়া নয়। প্রায় ৭৮ দশমিক ৭ শতাংশ প্রশিক্ষণার্থী মূলত দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। বিদেশে চাকরির উদ্দেশ্যে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন মাত্র ৩৭ দশমিক ৯ শতাংশ।
এর ফলে প্রশিক্ষণব্যবস্থা ও বিদেশমুখী কর্মসংস্থানের মধ্যে একটি বড় ধরনের সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছে। অনেক প্রশিক্ষণার্থী এমন দক্ষতা অর্জন করছেন, যা সরাসরি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে মিলছে না।
কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতার ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় ঘাটতি। ৪০টি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতিটি কেন্দ্রে গড়ে ৭৩টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে প্রায় ৩৬টি পদ খালি রয়েছে। এর মধ্যে প্রশিক্ষকের অনুমোদিত পদের গড়ে ২১টি শূন্য।
কোনো কোনো প্রশিক্ষণকেন্দ্রে একজন প্রশিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক হাজারের বেশি। ফলে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষক ও আধুনিক সুবিধার অভাবে অনেক ক্ষেত্রে মানসম্মত প্রশিক্ষণ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশি শ্রমবাজার এখন আগের মতো শুধু শারীরিক শ্রমের ওপর নির্ভর করছে না। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইউরোপের মতো বাজারে ভাষাগত দক্ষতা, নির্দিষ্ট কারিগরি জ্ঞান, নিরাপত্তা মান এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দক্ষতার প্রমাণ প্রয়োজন হচ্ছে।
জাপানে নির্দিষ্ট দক্ষ কর্মী ব্যবস্থার আওতায় ভাষা ও পেশাগত দক্ষতার পরীক্ষা নেওয়া হয়। দক্ষিণ কোরিয়াতেও ভাষা ও কাজের সক্ষমতা যাচাই গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের দক্ষতা উন্নয়ন উদ্যোগের লক্ষ্যও হচ্ছে দেশের প্রশিক্ষণব্যবস্থাকে ইউরোপের শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের বড় সমস্যা শুধু দক্ষতার ঘাটতি নয়, বরং কোন দেশে কী ধরনের কর্মীর চাহিদা রয়েছে, সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার অভাব।
সিপিডির গবেষকরা মনে করেন, বিভিন্ন দেশের শ্রমবাজারের চাহিদা নিয়মিত বিশ্লেষণ করে প্রশিক্ষণের কারিকুলাম, প্রশিক্ষকের দক্ষতা এবং প্রশিক্ষণের আসনসংখ্যা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর প্রায় ১৭৫টি দেশে কর্মী গেলেও মোট কর্মীর প্রায় ৯৪ শতাংশ মাত্র কয়েকটি নির্দিষ্ট দেশে যাচ্ছে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর পাশাপাশি মালয়েশিয়াও গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। ফলে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও মূলত এসব দেশের চাহিদাকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে।
তবে নতুন শ্রমবাজারে প্রবেশের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপের মতো বাজারে শুধু কর্মীর সংখ্যা নয়, কাজের মান, ভাষা দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশকে শুধু বেশি সংখ্যক কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য থেকে বের হয়ে দক্ষ ও উচ্চ আয়ের কর্মী তৈরির দিকে যেতে হবে। কারণ দক্ষ কর্মীরাই আন্তর্জাতিক বাজারে ভালো মজুরি এবং দীর্ঘমেয়াদি সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সাবেক বিএমইটি পরিচালক ড. মো. নুরুল ইসলাম বলেন, গত দুই দশকে দেশের কারিগরি প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় উন্নতি হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে প্রশিক্ষণ পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়নি।
তার মতে, প্রশিক্ষক সংকট, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা না করা এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, বিদেশে কত কর্মী পাঠানো হলো—শুধু এই সংখ্যা দিয়ে অভিবাসনের সফলতা বিচার করার সুযোগ নেই। একজন কর্মী কোন দক্ষতা নিয়ে গেলেন, সেই দক্ষতার স্বীকৃতি আছে কি না, তিনি একই পেশায় কাজ করছেন কি না এবং কতটা ভালো আয় করছেন—এসব বিষয়ও এখন গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ তাই নির্ভর করছে শুধু কর্মী পাঠানোর ওপর নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী দক্ষ জনশক্তি তৈরির সক্ষমতার ওপর।

