দাম বাড়ানোর পরও বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হচ্ছে না। খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতি লিটারে লাভ খুব কম হওয়ায় তারা নির্ধারিত দামে তেল বিক্রি করতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এর ফলে বাজারে সরবরাহে অনিয়ম তৈরি হচ্ছে এবং অনেক ভোক্তাকে বাড়তি দামে তেল কিনতে হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল তারা কিনছেন প্রায় ২০৩ টাকায়। অথচ সরকার নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ২০৫ টাকা হওয়ায় প্রতি লিটারে তাদের লাভ থাকছে মাত্র ২ টাকা।
খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, এই সামান্য লাভ দিয়ে দোকানের অন্যান্য খরচ চালানো সম্ভব নয়। পলিথিন ব্যাগ, শ্রমিক খরচসহ বিভিন্ন ব্যয় বিবেচনায় নিলে প্রকৃত লাভ আরও কমে যায়। এ কারণে অনেক ব্যবসায়ী সরকারি নির্ধারিত দামে বোতলজাত সয়াবিন তেল মজুত ও বিক্রি করতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন।
তবে কিছু এলাকায় নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সয়াবিন তেল বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। কিছু দোকানে এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল প্রায় ২১০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর বিসমিল্লাহ স্টোরের মালিক লতিফ আহমা বলেন, পাঁচটি এক লিটারের বোতল ও দুটি পাঁচ লিটারের বোতল কিনতে তাকে ৩ হাজার টাকার বেশি বিনিয়োগ করতে হয়েছে। কিন্তু এতে তার লাভ হয়েছে মাত্র ১০ থেকে ১৫ টাকা। এত কম লাভে ব্যবসা চালানো কঠিন বলে তিনি জানান।
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বাজারের পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় কম রয়েছে। সাম্প্রতিক দাম বাড়ানোর আগেও বাজারে এই সংকট দেখা দিয়েছিল।
বোতলজাত তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় অনেক ক্রেতা এখন খোলা সয়াবিন তেলের দিকে ঝুঁকছেন। এতে খোলা তেলের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি দামও বাড়ছে।
বর্তমানে খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২১০ টাকা লিটারে, যা নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রায় ১৫ টাকা বেশি।
যাত্রাবাড়ীর এক খুচরা বিক্রেতা মনির আহমদ জানান, ১০ থেকে ১২ দিন আগেও খোলা সয়াবিন তেলের দাম ছিল ১৯০ থেকে ২০০ টাকা লিটার। কিন্তু বর্তমানে তাদের কিনতেই ২০০ টাকার বেশি খরচ হচ্ছে।
রাজধানীর প্রায় ২০টি দোকান পরিদর্শনে দেখা গেছে, অনেক দোকানে এক লিটারের বোতলজাত তেল সীমিত পরিমাণে পাওয়া গেলেও পাঁচ লিটারের বোতলের সরবরাহ তুলনামূলক বেশি রয়েছে।
মগবাজারের দোকানি কাদির মোল্লা বলেন, সাধারণত তিনি এক কার্টন এক লিটারের বোতল বিক্রি করতেন। কিন্তু বর্তমানে সরবরাহ কম থাকায় অর্ধেক কার্টনের বেশি বিক্রি করতে পারছেন না।
তিনি বলেন, প্রতি লিটারে মাত্র ২ টাকা লাভ দিয়ে অতিরিক্ত খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে নির্ধারিত দামে পণ্য বিক্রি করা অনেক সময় ব্যবসায়ীদের জন্য লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সরকার গত ৩ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয় বাড়ার কারণ দেখিয়ে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে ৫ টাকা বাড়িয়ে ২০৪ টাকা নির্ধারণ করে।
এর পর বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড ভ্যানস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম আরও বেড়েছে।
সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ৩ সেপ্টেম্বর দাম সমন্বয়ের সময় আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম ছিল প্রতি টন প্রায় ১ হাজার ২৭০ ডলার। সেই হিসাবে দেশে বোতলজাত সয়াবিন তেলের প্রকৃত খরচ প্রায় ২২১ টাকা লিটার বলে দাবি করেছে সংগঠনটি।
তারা আরও জানিয়েছে, গত ছয় মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম প্রায় ১ হাজার ২০০ ডলার থেকে বেড়ে ১ হাজার ৩২৫ ডলারে পৌঁছেছে। বর্তমান দামে হিসাব করলে বোতলজাত সয়াবিন তেলের খরচ দাঁড়ায় প্রায় ২৩৩ টাকা লিটার।
রিফাইনাররা বলছেন, সরকারের অনুরোধে তারা এখনো বাজারে সরবরাহ চালিয়ে যাচ্ছেন, যদিও এতে তাদের বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে।
তবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, ব্যবসায়ীদের দাবির ভিত্তিতে তেলের দাম বাড়ানোর বিষয়ে সরকার এখনই সিদ্ধান্ত নেবে না। বাজার পরিস্থিতি ও ব্যবসায়ীদের দাবির যৌক্তিকতা যাচাই করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি ব্যয় এবং খুচরা পর্যায়ের লাভের কাঠামো—সবকিছু সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত নেওয়া না হলে সয়াবিন তেলের বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক করা কঠিন হতে পারে।

