চলতি অর্থবছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর—এই তিন মাসে ব্যাংক খাত থেকে সরকারি ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ নিলাম সূচি অনুযায়ী, ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে এই সময়ে নিট ৩০ হাজার ১০৭ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে।
তবে এই ঋণের পরিমাণ আগের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম। ওই তিন মাসে সরকারি সিকিউরিটিজের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেশি নিট ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি এবং সরকারের ব্যয় বাড়তে থাকায় ব্যাংকনির্ভর ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। বিশেষ করে সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের কারণে আগামী সময়ে সরকারের ব্যয়ের চাপ আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা কম হয়েছে। একই সময়ে আগের অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব আদায় কমেছে ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ।
নতুন বেতন কাঠামোও সরকারের ব্যয়ে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। নতুন কাঠামোর মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়নের কথা রয়েছে—চলতি বছরের জুলাই, ডিসেম্বর এবং আগামী বছরের জুলাইয়ে। আর নতুন কাঠামোর সব ধরনের ভাতা ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে।
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে তিন বছরে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে ১ লাখ ৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু ২০২৬ সালের ডিসেম্বরেই অতিরিক্ত ৩৭ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রয়োজন হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বাড়লে সুদ পরিশোধের ব্যয়ও বাড়বে। এতে সরকারের রাজস্ব সংগ্রহের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশিষ্ট ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ নেওয়া বাড়ার অর্থ হলো সরকারি কোষাগারে তারল্যের ওপর চাপ রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকনির্ভর ঋণ নেওয়া টেকসই পদ্ধতি নয়। কারণ ধার করা অর্থ একসময় সরকারকে পরিশোধ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকারের ঋণের চাহিদা বাড়তে থাকলে বেসরকারি খাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। বর্তমানে ব্যাংকগুলোতে পর্যাপ্ত তারল্য থাকলেও ভবিষ্যতে সরকারি ঋণ নেওয়া ধারাবাহিকভাবে বাড়লে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে। সেই ব্যয় মেটাতে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হলে বাজেটে সুদ পরিশোধের ব্যয়ও বাড়বে। ফলে সরকারকে রাজস্ব আদায়ের ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
একজন ব্যাংকার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা তুলনামূলক কম থাকায় সরকারের বাড়তি ঋণ নেওয়ার তাৎক্ষণিক প্রভাব খুব বেশি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। অনেক বাণিজ্যিক ব্যাংকের হাতেই এখন পর্যাপ্ত তারল্য রয়েছে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ভবিষ্যতে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা বাড়লে সরকারের ধারাবাহিক ব্যাংকঋণ বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার সক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদে সরকারের ব্যাংকনির্ভর ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানো প্রয়োজন।

