বাংলাদেশে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের প্রবাহ সেপ্টেম্বরে কমে ১১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২৭৬ কোটি মার্কিন ডলার। তবে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই অর্থের পরিমাণ ৩ শতাংশ বেশি।
আগস্টে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ২৯৬ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ২২ শতাংশ বেশি ছিল। সেই হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে সেপ্টেম্বরে রেমিট্যান্স কমেছে প্রায় ৭ শতাংশ। চলতি বছরের মে পর্যন্ত টানা ছয় মাস দেশে মাসিক রেমিট্যান্সের পরিমাণ ৩০০ কোটি ডলারের বেশি ছিল। এরপর থেকেই তা এই সীমার নিচে নেমে আসে।
তবে পুরো বছরের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৮৫৯ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ৭৫৮ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রথম প্রান্তিকে রেমিট্যান্স বেড়েছে ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ার পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও অস্থিরতার প্রভাব রয়েছে। বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক প্রবাসী শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত। সেখানে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া, কর্মসংস্থানে অনিশ্চয়তা এবং আয় কমে যাওয়ার প্রভাব দেশে পাঠানো অর্থের ওপরও পড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, সাম্প্রতিক সংঘাত ও উত্তেজনার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে প্রবাসীদের নিজেদের খরচও বেড়েছে, যা দেশে অর্থ পাঠানোর প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, আমদানি বিলসহ অন্যান্য বৈদেশিক দায় মেটাতে প্রয়োজনীয় ডলার সংগ্রহের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে নিজেদের উদ্যোগে ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোও ডলার সংগ্রহে নিজস্ব উদ্যোগ বাড়াচ্ছে।
এদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক মুদ্রানীতি বিবৃতিতে বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়াকে অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
রপ্তানি আয় যখন ওঠানামার মধ্যে রয়েছে এবং আমদানি ব্যয়ও তুলনামূলক বেশি, তখন বৈদেশিক লেনদেনের চাপ সামলাতে রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আমদানি ব্যয় ও বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধের মতো প্রয়োজনেও এই বৈদেশিক মুদ্রা সহায়তা দিতে পারে বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা।
অন্যদিকে, বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য বাংলাদেশিদের যাওয়ার হারও কমেছে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৯ লাখ ৭০ হাজার বাংলাদেশি কাজের জন্য বিদেশে গেছেন। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই সংখ্যা ৫ শতাংশ কম এবং গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
টানা দুই বছর বিদেশে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতের রেমিট্যান্স প্রবাহ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজনও বাড়তে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, রেমিট্যান্সের উৎস হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো প্রয়োজন। এ জন্য মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ অন্যান্য দেশে আরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর মাধ্যমে প্রবাসী আয়ের উৎস বৈচিত্র্যময় করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

