গত ২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা বিষয়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মাধ্যমে দুই দেশের সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পারমাণবিক নিরাপত্তার মানদণ্ড উন্নয়ন, প্রযুক্তি বিনিময় এবং কৌশলগত দিকগুলো পর্যালোচনার আইনি ও কূটনৈতিক পথ উন্মুক্ত হলো। সম্প্রতি দ্য ডেইলি স্টার-এ প্রকাশিত এক বিশেষ বিশ্লেষণে সাংবাদিক তানিম আহমেদ তুলে ধরেছেন যে, পাঁচ পৃষ্ঠার এই সমঝোতা স্মারকটি মূলত কোনো বাধ্যতামূলক চুক্তি নয়, বরং এটি দুই দেশের পারমাণবিক খাতে ভবিষ্যতে বড় ধরনের দ্বিপক্ষীয় অংশীদারিত্ব বা ‘১২৩ চুক্তি’ স্বাক্ষরের একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ।
দৈনিকটির হাতে আসা পাঁচ পৃষ্ঠার নথি অনুযায়ী, এই সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি কোনো পারমাণবিক উপাদান হস্তান্তর বা বেচাকেনার আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৫৪ সালের অ্যাটমিক এনার্জি অ্যাক্টের ‘১২৩ ধারা’ অনুযায়ী অন্য যেকোনো দেশের সাথে পারমাণবিক প্রযুক্তি বা উপাদান বিনিময়ের আগে এ ধরনের একটি ফ্রেমওয়ার্ক সমঝোতা থাকা বাধ্যতামূলক। ইতিপূর্বে ১৯৮১ সালেও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের একটি ‘১২৩ চুক্তি’ হয়েছিল, যার মেয়াদ পরবর্তীতে শেষ হয়ে যায়। নতুন এই সমঝোতা স্মারকের প্রথম ধারায় জাতীয়, জ্বালানি ও সাইবার নিরাপত্তা বৃদ্ধি, স্বাধীন তদারকি সক্ষমতা গড়ে তোলা, সাইবার সুরক্ষা এবং পারমাণবিক বর্জ্য বা উপাদান যাতে ভুল হাতে না পড়ে তা নিশ্চিতে উপযুক্ত নিরাপত্তা বিধিমালা তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
আমেরিকান এই উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশে ‘স্মল মডুলার রিঅ্যাক্টর’ (এসএমআর)-এর মতো সর্বাধুনিক পারমাণবিক প্রযুক্তির বিকাশ, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন এবং স্থানীয় জনবলের সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে। এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর দেশের জনমনে একটি প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল যে, পাবনার রূপপুরে নির্মাণাধীন রাশিয়ার পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কি না কিংবা সেখান থেকে ইউরেনিয়াম কেনার বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে কি না। বিশ্লেষণে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, এই সমঝোতা স্মারকের সাথে রূপপুর প্রকল্পের দূরতম সম্পর্কও নেই। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টাও বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন। এছাড়া স্মারকের দ্বিতীয় ও পঞ্চম ধারায় স্পষ্ট করা হয়েছে যে, এই নথি অনুযায়ী উভয় দেশ নিজস্ব আইন মেনে কাজ করবে এবং এটি আন্তর্জাতিক বা দেশীয় আইনের অধীনে কোনো বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না। ফলে অন্য কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের পারমাণবিক সহযোগিতায় যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে এটি বাধা হিসেবে দাঁড়াবে না।
পাঁচ বছর মেয়াদি এই সমঝোতা স্মারকটিতে দুই পক্ষের বাণিজ্যিক স্বার্থের গোপনীয়তা রক্ষার বিশেষ শর্তও যুক্ত রয়েছে, যা কোনো পক্ষ নোটিশ না দিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আরও পাঁচ বছরের জন্য নবায়ন হবে। ২০১৯ সালে চালু করা যুক্তরাষ্ট্রের এই বিশেষ পারমাণবিক কর্মসূচির আওতায় পোল্যান্ড, ঘানা, রোমানিয়া ও ফিলিপাইনের মতো একাধিক দেশ ইতোমধ্যেই মার্কিন প্রশাসনের সাথে এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে, যার ধারাবাহিকতায় ফিলিপাইন ২০২৪ সালে পূর্ণাঙ্গ ‘১২৩ চুক্তি’ বাস্তবায়ন করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই স্মারকটি ভবিষ্যতে আমেরিকার সরকারি ও বেসরকারি খাতগুলোর সাথে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া এবং পারমাণবিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে একটি সুরক্ষিত রাজনৈতিক ও কৌশলগত পরিসর তৈরি করবে।

