বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সোনালি আঁশ পাটকে নতুনভাবে কাজে লাগিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কাঁচা পাট রপ্তানির পরিবর্তে পাট থেকে তৈরি উচ্চমূল্যের বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানির ওপর এখন বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেছেন, দেশের উৎপাদিত পাটের যত বেশি সম্ভব অংশকে মূল্য সংযোজিত পণ্যে রূপান্তর করা সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। এর মাধ্যমে শুধু রপ্তানি আয়ই বাড়বে না, পাশাপাশি দেশের শিল্প খাতেও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
শনিবার ঢাকার তেজগাঁওয়ে পাট বহুমুখীকরণ প্রচার কেন্দ্রের (জেডিপিসি) প্রাঙ্গণে ছয় দিনব্যাপী “বহুমুখী পাটপণ্য মেলা” এবং নতুন বিক্রয়কেন্দ্র “জেডিপিসি এক্সপ্রেস”-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন মন্ত্রী।
তিনি জানান, তৈরি পোশাক শিল্পের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাত যেমন রেশম, তাঁত এবং বহুমুখী পাটপণ্যের উন্নয়নেও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। এসব খাতকে শক্তিশালী করতে পারলে দেশের রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
মন্ত্রী বলেন, জেডিপিসির স্থায়ী প্রদর্শনী ও বিক্রয়কেন্দ্র দেশীয় পণ্যের প্রচার এবং বাজার সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি বিভিন্ন মেলা ও প্রদর্শনীর মাধ্যমে দেশের ক্রেতাদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছেও বাংলাদেশি পণ্যের পরিচিতি বাড়ানো সম্ভব হবে।
তিনি জানান, মেলায় প্রদর্শিত পণ্যের মধ্যে রয়েছে যন্ত্রে তৈরি এবং হাতে তৈরি বিভিন্ন ধরনের পণ্য। এর মধ্যে অনেক পণ্য দেশের কুটির শিল্প ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে। ফলে পাটভিত্তিক শিল্প শুধু রপ্তানি আয় নয়, গ্রামীণ অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পাট রপ্তানির সম্ভাবনা নিয়ে মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে কাঁচা পাট রপ্তানি করলে খুব বেশি মূল্য সংযোজন হয় না। কিন্তু একই পাট প্রক্রিয়াজাত করে স্লাইভার, প্যাকেজিং সামগ্রী এবং বিভিন্ন ধরনের মিশ্র আঁশের পণ্য তৈরি করলে আয় কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, গত বছর বাজারের সর্বোচ্চ সময়ে এক টন কাঁচা পাটের দাম ছিল প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা, যা প্রায় ১ হাজার ২০০ ডলারের সমান। কিন্তু একই পরিমাণ পাট দিয়ে প্যাকেজিং পণ্য তৈরি করলে আয় হতে পারে প্রায় ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ ডলার পর্যন্ত।
আর পাটের সঙ্গে তুলা বা অন্য কোনো আঁশ মিশিয়ে উন্নতমানের মিশ্র আঁশের পণ্য তৈরি করা গেলে প্রতি টনে আয় ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার ডলার পর্যন্ত হতে পারে বলে জানান তিনি।
সরকারের পরিকল্পনা হচ্ছে দেশের মোট পাট উৎপাদনের বড় একটি অংশকে সরাসরি কাঁচামাল হিসেবে রপ্তানি না করে বিভিন্ন ধরনের মূল্য সংযোজিত পণ্যে রূপান্তর করা। এ বিষয়ে পাট বহুমুখীকরণ প্রচার কেন্দ্র এবং বেসরকারি উদ্যোক্তা সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে।
মন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, পাটের ব্যবহার বাড়িয়ে এবং নতুন নতুন পণ্য তৈরি করে বাংলাদেশ এই খাত থেকে আরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারবে। একই সঙ্গে দেশের ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প আবারও আন্তর্জাতিক বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করবে।
অনুষ্ঠানে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শরিফুল আলম বলেন, এই মেলার মূল উদ্দেশ্য হলো দেশীয় পণ্যের প্রচার বৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব পণ্যের ব্যবহার উৎসাহিত করা এবং পলিথিনের ব্যবহার কমানো।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য, বহুমুখী পাটপণ্য, রাজশাহীর রেশম, তাঁতপণ্যসহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী পণ্যকে দেশ ও বিদেশে আরও পরিচিত করে তুলতে সরকার কাজ করছে।
তিনি আরও বলেন, একসময় সোনালি আঁশ পাট বাংলাদেশের গর্ব ও মানুষের আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সেই ঐতিহ্যের অনেকটাই হারিয়ে গেছে। এখন নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে পাটের সেই হারানো গুরুত্ব ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
শরিফুল আলম জানান, পাট উৎপাদন বৃদ্ধি, বহুমুখী পাটপণ্যের ব্যবহার সম্প্রসারণ, দেশি ও আন্তর্জাতিক বাজার তৈরি এবং পণ্যে মূল্য সংযোজন বাড়ানোর লক্ষ্যেই এ ধরনের মেলার আয়োজন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, জেডিপিসি প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের মেলার আয়োজন করে আসছে। নতুন “জেডিপিসি এক্সপ্রেস” একটি স্থায়ী প্রদর্শনী ও বিক্রয়কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে, যেখানে বহুমুখী পাটপণ্যের পাশাপাশি তাঁত ও রেশম পণ্যও পাওয়া যাবে।
সরকার দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতেও এ ধরনের প্রদর্শনী ও বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোতেও দেশীয় পণ্যের প্রদর্শনী কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পণ্যের পরিচিতি বাড়াতে কার্যকর প্রচারণার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, উদ্যোক্তা ও গণমাধ্যমের সহযোগিতায় দেশের ঐতিহ্যবাহী পণ্যগুলোকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরতে সরকার কাজ করছে।
তেজগাঁওয়ে আয়োজিত ছয় দিনব্যাপী এই মেলা ৩ অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে এবং চলবে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মেলা চলবে। অন্যদিকে “জেডিপিসি এক্সপ্রেস” বিক্রয়কেন্দ্র সপ্তাহের সাত দিন সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের পাট খাতের ভবিষ্যৎ শুধু কাঁচা পাট রপ্তানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবেশবান্ধব পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদা বাড়ার এই সময়ে পাট থেকে তৈরি ব্যাগ, প্যাকেজিং সামগ্রী, পোশাক, মিশ্র আঁশ এবং অন্যান্য উন্নত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাংলাদেশ নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।

