বিশ্বজুড়ে ব্যবসা পরিচালনার ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন শুধু প্রযুক্তিগত সুবিধা নয়, বরং ব্যবসার দক্ষতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত এআই গ্রহণের দিকে এগিয়ে যেতে হবে বলে মত দিয়েছেন দেশের বিভিন্ন খাতের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যবসায়ী ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, শুধু প্রচলিত ডিজিটাল ব্যবস্থার উন্নয়ন করলেই হবে না, বরং প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন পদ্ধতিতেই বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন নেতৃত্বের দৃঢ় সিদ্ধান্ত, উন্নত তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা।
রাজধানীর তেজগাঁওয়ে শপআপের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত “অল অ্যাবাউট এআই” শীর্ষক আলোচনায় এসব বিষয় উঠে আসে। অনুষ্ঠানে ব্যাংকিং, প্রযুক্তি, তথ্য বিশ্লেষণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনা খাতের শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশ নেন।
শপআপের সভাপতি মামুন রশীদ বলেন, বাংলাদেশের আর্থিক ও ব্যবসায়িক খাত বর্তমানে বড় ধরনের প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের জন্য ব্যবসায়িক নেতৃত্বকে প্রচলিত পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে নতুন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
তিনি বলেন, কেবল ছোটখাটো ডিজিটাল পরিবর্তন নয়, প্রতিষ্ঠান কীভাবে পরিচালিত হবে, কীভাবে গ্রাহকদের সেবা দেওয়া হবে এবং কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, সেই বিষয়গুলো নতুন করে ভাবতে হবে। দ্রুত উন্নয়নশীল এআই প্রযুক্তির যুগে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এই পরিবর্তন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসির স্বতন্ত্র পরিচালক খোন্দকার আতিকে-ই-রাব্বানি এফসিএ বলেন, বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির কারণে ব্যবসা পরিচালনার ধরন, প্রতিযোগিতা এবং মূল্য তৈরির পদ্ধতিতে মৌলিক পরিবর্তন আসছে। তাই প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখন থেকেই ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।
ঢাকা ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ওসমান এরশাদ ফয়েজ বলেন, ব্যাংকিং খাত সাধারণত নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও ঝুঁকির কারণে তুলনামূলকভাবে সতর্ক থাকে। ফলে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে অনেক সময় ধীরগতি দেখা যায়।
তবে তিনি মনে করেন, ব্যাংকিং খাতে এআই প্রথমে অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমের দক্ষতা বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে গ্রাহকমুখী মূল ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঝুঁকি ছাড়াই প্রযুক্তির সুবিধা নেওয়া সম্ভব।
তিনি বলেন, এআই ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যাংকের পেছনের প্রশাসনিক কাজে নিয়োজিত কর্মীদের একটি বড় অংশকে বিক্রয় ও গ্রাহক সম্পর্ক ব্যবস্থাপনায় কাজে লাগানো সম্ভব হতে পারে। পাশাপাশি বিভিন্ন উৎসে থাকা পুরোনো গ্রাহক তথ্য একত্র করে আরও ব্যক্তিগতকৃত আর্থিক সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, “এআই মানুষকে প্রতিস্থাপন করবে না, তবে যারা এআই ব্যবহার করবে তারা যারা ব্যবহার করবে না তাদের জায়গা দখল করবে।”
শপআপের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আতাউর রহিম চৌধুরী বলেন, আধুনিক এআই প্রযুক্তি এমন পর্যায়ে যাচ্ছে যেখানে প্রতিষ্ঠানের অনেক নিয়মিত কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
তিনি জানান, চালান যাচাই, বার্তার মাধ্যমে পণ্য পরিবহন সংক্রান্ত তথ্য প্রদান, মূল্য নির্ধারণের প্রশ্নের উত্তর এবং আর্থিক সফটওয়্যারে হাতে তথ্য প্রবেশের মতো কাজগুলো ভবিষ্যতে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে অনেকাংশে স্বয়ংক্রিয় হয়ে যেতে পারে।
ওলিনের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা ড. নিয়ামুল কাদের বলেন, এআই প্রযুক্তির সম্ভাবনা এখনও পুরোপুরি ব্যবহৃত হয়নি। বর্তমান পর্যায়েই এই প্রযুক্তি বিশ্ব অর্থনীতিতে শত শত বিলিয়ন ডলারের মূল্য তৈরি করছে।
তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেন, এআই ও রোবোটিকসের সমন্বয়ে কৃষি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
সিলকের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা সুজাত আলী বলেন, সফটওয়্যার উন্নয়ন খাতেও এআই ইতোমধ্যে বড় পরিবর্তন এনেছে। শপআপে বর্তমানে প্রকৌশল সংক্রান্ত কোডের ৯৯ শতাংশের বেশি এআইয়ের সহায়তায় তৈরি হচ্ছে বলে তিনি জানান।
শপআপের পণ্য বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট এআরএম আবদুল্লাহ বলেন, এআই ব্যবহারের ফলে নতুন পণ্যের নমুনা তৈরি করার সময় কয়েক সপ্তাহ থেকে কমে প্রায় এক ঘণ্টায় নেমে এসেছে। পাশাপাশি মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু তথ্য দেখতে নয়, বরং তথ্য বিশ্লেষণ করে সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করার সক্ষমতাও অর্জন করছে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসির প্রধান ডিজিটাল কর্মকর্তা খালিদ হোসাইন বলেন, তাদের ব্যাংকের কথোপকথনভিত্তিক এআই সহকারী গত এক বছরে গ্রাহকসেবার প্রায় ৭ শতাংশ অনুরোধ সম্পূর্ণভাবে মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই সমাধান করেছে। বছরের শেষ নাগাদ এই হার ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
এনএনএস সলিউশনের পরিচালক এসএম সাইফুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো আর্থিক সক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রক পরিবেশের কারণে এআই ব্যবহারে এগিয়ে রয়েছে। তবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য শক্তিশালী তথ্য আদান-প্রদান ব্যবস্থা এবং আধুনিক প্রযুক্তি অবকাঠামো তৈরি করা জরুরি।
প্রাইসওয়াটারহাউসকুপার্সের তথ্য বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান শরীফুল হাসনাইন সবুজ বলেন, বড় পরিসরে এআই প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে প্রতিষ্ঠানগুলোকে তথ্যের ঘাটতি দূর করতে হবে। পাশাপাশি তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবহারের জন্য একটি অভিন্ন কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই এখন আর ভবিষ্যতের কোনো দূরের প্রযুক্তি নয়, বরং বর্তমান ব্যবসার বাস্তব অংশ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সময়মতো এই প্রযুক্তি গ্রহণ করতে পারে, তাহলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, খরচ কমানো, গ্রাহকসেবা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার সুযোগ তৈরি হবে। তবে সফল এআই ব্যবহারের জন্য শুধু প্রযুক্তি নয়, প্রয়োজন দক্ষ জনবল, মানসম্মত তথ্য এবং দূরদর্শী নেতৃত্ব।

