ব্যাংকিং সময়ের বাইরে অর্থ পরিশোধের সীমাবদ্ধতা এবং ছুটির দিনে সরবরাহ শৃঙ্খলের মূল অংশীজনদের নিষ্ক্রিয়তার কারণে চট্টগ্রাম ও ঢাকা কাস্টম হাউসের ২৪/৭ শুল্কায়ন কার্যক্রম জটিলতায় পড়েছে। ফলে আমদানিকারকেরা দ্রুত ও দক্ষভাবে পণ্য খালাস করতে পারছেন না।
বাণিজ্যিক কার্যক্রম গতিশীল করতে গত ১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর বন্দর ও কাস্টম হাউসগুলো সপ্তাহে সাত দিন, প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখা শুরু হয়। তবে অংশীজনেরা বলছেন, সমস্যার মূল জায়গা আর্থিক অবকাঠামো। বিশেষ করে রিয়েল-টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট বা আরটিজিএস ব্যবস্থা ব্যাংকিং সময়ের পর এবং সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটির দিনে বন্ধ থাকে।
এ ছাড়া ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশের (এনপিএসবি) দৈনিক লেনদেনের নির্দিষ্ট সীমা থাকায় নিয়মিত ব্যাংকিং সময়ের বাইরে আমদানিকারকেরা বড় অঙ্কের বন্দর বিল ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরিশোধ করতে পারছেন না। পণ্য খালাস প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত দুই ডজনেরও বেশি সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সীমিত জনবল ছুটির দিনে সমস্যাকে আরও ঘনীভূত করছে।
এই পরিস্থিতিতে নিরবচ্ছিন্ন অর্থ পরিশোধ সেবা নিশ্চিত করতে আরটিজিএস ২৪ ঘণ্টা চালু রাখা এবং এনপিএসবির লেনদেন সীমা তুলে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। গত ১ সেপ্টেম্বর নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে এ অনুরোধ করা হয়। চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন বন্দরের সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সৈয়দ রেফায়েত হামিম।
চিঠিতে বলা হয়, বন্দরের কার্যক্রম ২৪/৭ সচল থাকায় গভীর রাতে কিংবা শুক্রবার, শনিবারসহ সরকারি ছুটির দিনেও প্রচুর বিল অনলাইনে তৈরি হচ্ছে। বিলিং ব্যবস্থা শতভাগ অনলাইনে হলেও ব্যাংকিং চ্যানেল ও পেমেন্ট গেটওয়ের সীমাবদ্ধতার কারণে ডিজিটাল পেমেন্টের পূর্ণ সুফল মিলছে না। ছুটির দিনে ও ব্যাংকিং সময়ের পর আরটিজিএস বন্ধ থাকায় আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা তাৎক্ষণিকভাবে বিল দিতে পারেন না। এক লাখ টাকার কম অঙ্কের বিলও আরটিজিএসের মাধ্যমে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না।
এনপিএসবির সীমাও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে দৈনিক সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পাঠানো যায়, তবে প্রতি লেনদেনে সীমা তিন লাখ টাকা। করপোরেট অ্যাকাউন্ট থেকে দৈনিক সীমা ২৫ লাখ টাকা এবং প্রতি লেনদেনে পাঁচ লাখ টাকা। কিন্তু বন্দরের বিভিন্ন অপারেশনাল বিল অনেক সময় এর চেয়ে বেশি হয়। তখন তা এনপিএসবির মাধ্যমে পরিশোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে নিয়মিত ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু না হওয়া পর্যন্ত আমদানিকারকদের অপেক্ষা করতে হয়।
পণ্য খালাসের পরিসংখ্যানেও এই সমন্বয়হীনতার চিত্র স্পষ্ট। গত ১৮ ও ১৯ সেপ্টেম্বরের সাপ্তাহিক ছুটিতে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে ১ হাজার ৩২৮টি বিল অব এন্ট্রি নথিভুক্ত হয়। এর মধ্যে মাত্র ৩১টি চালানের মূল্যায়ন সম্পন্ন করে ৫ দশমিক ১৫ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়। শুক্রবার সকাল আটটা থেকে শনিবার সকাল আটটা পর্যন্ত বন্দর থেকে ডেলিভারি হয়েছে মাত্র ২ হাজার ৪২৩ টিইইউএস কনটেইনার। স্বাভাবিক কর্মদিবসে এই সংখ্যা থাকে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার ৫০০ টিইইউএস।
কাস্টমস কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, বিল অব এন্ট্রি দাখিল পণ্য খালাসের কেবল প্রথম ধাপ। এরপর মূল্যায়ন, শুল্ক পরিশোধ, শিপিং এজেন্টের কাছ থেকে ডেলিভারি অর্ডার সংগ্রহ এবং বন্দর থেকে পণ্য ডেলিভারির মতো আরও কয়েকটি ধাপ পেরোতে হয়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানান, ছুটির দিনে ট্রাক ও ট্রেইলারের স্বল্পতা এবং বেসরকারি আমদানিকারকদের সীমিত কার্যক্রমের কারণেও ডেলিভারি কম থাকে।
একই চিত্র ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও। ছুটির দিনে আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের উপস্থিতি কম থাকায় পণ্য খালাসের গতি মারাত্মকভাবে কমে যায়। বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক রাগীব সামাদ জানান, প্রতিদিন জমতে থাকা খালাসবিহীন পণ্যের পরিমাণ এখন ৪০০ থেকে ৫০০ টনে পৌঁছেছে। তিনি কাস্টমসকে সাত দিনের মধ্যে মূল্যায়ন সম্পন্ন করার বিধান কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে এবং দীর্ঘদিন পড়ে থাকা চালান নিলামে তুলতে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। অন্যদিকে ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারেরা বলছেন, ছুটির দিনে কাজের বাড়তি শ্রমব্যয় মেটাতে প্রণোদনা বা বিশেষ ব্যবস্থার প্রয়োজন হতে পারে।
ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের কথা তুলে ধরে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, আমদানিকারকেরা স্বেচ্ছায় বন্দরে পণ্য ফেলে রাখেন না। অসহযোগিতা বা কাস্টমসের জটিলতার কারণে বিপুল অর্থ খরচ করে পণ্য আনার পরও দ্রুত খালাস করা যায় না।
ব্যবসায়ীরা জানান, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অন্তত ২৬টি সংস্থা জড়িত। এর মধ্যে আছে কাস্টমস, বন্দর, ব্যাংক, শিপিং এজেন্ট, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট। এসব সংস্থার মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সমন্বয় থাকা জরুরি বলে তাঁরা মনে করেন।
এমঅ্যান্ডএম ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ বলেন, সরকার সাত দিনই কাস্টমস কার্যক্রম চালু রাখতে চাইলে স্বাভাবিক কর্মদিবসের মতো পূর্ণ জনবল ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে এই প্রক্রিয়ার আওতায় আনতে হবে।
সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা মাঠপর্যায়ের কিছু চ্যালেঞ্জের কথাও জানিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য, ছুটির দিনে যেসব কাস্টমস কর্মকর্তাকে অন্য বিভাগ থেকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাঁরা অনেক সময় সংশ্লিষ্ট শাখার স্থানীয় শুল্কায়ন নিয়ম ও এসআরও সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত থাকেন না। চট্টগ্রাম সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী মাহমুদ ইমাম বলেন, অন্য শাখা থেকে আসা কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট মূল্যায়ন বিধি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয়তা নিয়ে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা না-ও থাকতে পারে।
এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বড় ধরনের রাজস্ব ঘাটতির মধ্যেই ছুটির দিনে কাস্টমস কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২১ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা। বিপরীতে আদায় হয়েছে ১৪ হাজার ১৭ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। ফলে এই সময়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৫১২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
কাস্টমস কর্তৃপক্ষ আশা করছে, ২৪/৭ বন্দর কার্যক্রম পুরোপুরি চালু হলে আমদানি শুল্ক আদায় বাড়বে এবং বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়তা মিলবে। তবে ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, এই উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে কাস্টমস, বন্দর, ব্যাংক, শিপিং এজেন্ট, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও আমদানিকারকদের কার্যক্রম কতটা সমন্বিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে তার ওপর।

