বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই বাড়ানোর লক্ষ্যে নতুন একটি উদ্যোগ নিয়েছে দেশের বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা। দেশে ও বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আনার চেষ্টা করছে সরকার। এই উদ্যোগের আওতায় কেউ যদি নতুন বিদেশি বিনিয়োগ বাংলাদেশে আনতে সক্ষম হন, তাহলে তাকে দেওয়া হবে নগদ প্রণোদনা।
নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি কমপক্ষে ১০ লাখ ডলারের নতুন বিদেশি বিনিয়োগ বাংলাদেশে আনতে পারলে মোট বিনিয়োগের ১.২৫ শতাংশ নগদ পুরস্কার হিসেবে পাবেন। সরকারের লক্ষ্য হলো প্রবাসী বাংলাদেশি এবং দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের পেশাজীবীদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবহার করে নতুন বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে আগ্রহী করে তোলা।
দেশের বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা ইনভেস্ট বাংলাদেশ এই প্রণোদনা কার্যক্রম চালু করেছে। সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের অনেক নাগরিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক ও পেশাগত অবস্থানে রয়েছেন। তাদের সঙ্গে থাকা আন্তর্জাতিক যোগাযোগকে কাজে লাগাতে পারলে কম খরচে নতুন বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের সম্ভাবনা তুলে ধরা সম্ভব হবে।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে গত বছরের ভিত্তিতে প্রায় ৬০ কোটি ডলারের নতুন বিদেশি মূলধনী বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে বছরে গড়ে প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ আসে। তবে এর একটি বড় অংশ নতুন বিনিয়োগ নয়, বরং আগে থাকা বিনিয়োগের পুনঃবিনিয়োগ।
বাংলাদেশের জন্য বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ দীর্ঘদিনের একটি চ্যালেঞ্জ। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে এফডিআই প্রবাহ এখনো সীমিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অবকাঠামো বা বাজার সুবিধা থাকলেই বিনিয়োগ আসে না; আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের পরিচিতি, বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং আস্থার পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই সরকার নতুন কৌশল নিয়েছে। কারণ বিশ্বের অনেক সম্ভাবনাময় বিনিয়োগকারী এখনো বাংলাদেশের বাজার, শিল্প সক্ষমতা এবং বিনিয়োগের সুযোগ সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য জানেন না।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের নির্বাহী সদস্য নাহিয়ান রহমান রচি বলেন, অনেক উদীয়মান দেশের বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের বাজার সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা রাখেন না। কিন্তু বাংলাদেশকে বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবে প্রচার করার জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট সীমিত। তাই দেশের নাগরিক ও প্রবাসীদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবহার করে বিনিয়োগকারীদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
তার মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তাদের পরিচিতি ও সম্পর্ক ব্যবহার করে এমন অনেক বিনিয়োগকারীকে বাংলাদেশের দিকে আকৃষ্ট করা সম্ভব, যাদের কাছে এখনো দেশটির সম্ভাবনা স্পষ্ট নয়।
এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য থাকবে নতুন বিদেশি মূলধনী বিনিয়োগ আনা। পুরোনো বিনিয়োগ, বিদ্যমান ব্যবসার সম্প্রসারণ বা পুনঃবিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই সুবিধা দেওয়া হবে না।
প্রণোদনা পাওয়ার জন্য সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীকে আগে থেকেই এই কার্যক্রমের আওতায় নিবন্ধন করতে হবে। বিনিয়োগ বাংলাদেশে আসার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যাচাই করবে বিনিয়োগটি বাস্তব কি না এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি কেমন।
শুধু অর্থ দেশে আনা নয়, বিনিয়োগকারী প্রকৃতপক্ষে ব্যবসা শুরু করার উদ্যোগ নিয়েছেন কি না সেটিও বিবেচনা করা হবে। যেমন ব্যাংক হিসাব খোলা, জমি অধিগ্রহণ, নির্মাণকাজ শুরু করা বা প্রকল্প বাস্তবায়নের মতো কার্যক্রম যাচাই করা হবে।
প্রণোদনার অর্থ একবারে দেওয়া হবে না। দুই ধাপে তা পরিশোধ করা হবে। বিনিয়োগ যাচাই হওয়ার পর মোট প্রণোদনার ৫২ শতাংশ দেওয়া হবে। বাকি ৪৮ শতাংশ দেওয়া হবে প্রকল্প সম্পূর্ণ হওয়ার পর।
উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি বাংলাদেশে ১০০ কোটি টাকার নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আনতে পারেন, তাহলে তিনি ১ কোটি ২৫ লাখ টাকার প্রণোদনার অধিকারী হবেন। তবে কর ও অন্যান্য কর্তনের পর তার হাতে প্রায় ১ কোটি টাকা থাকতে পারে।
সরকারের মতে, এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য শুধু এফডিআইয়ের পরিমাণ বাড়ানো নয়, বরং এমন নতুন বিনিয়োগ আনা যা অন্যথায় হয়তো বাংলাদেশে আসত না।
বিশ্ববাজারে পরিবর্তিত পরিস্থিতিও বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে। উদাহরণ হিসেবে তুরস্কের কথা বলা হচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সুদের হারের কারণে দেশটির কিছু প্রতিষ্ঠান বিকল্প বিনিয়োগ গন্তব্য খুঁজছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও উন্নত টেক্সটাইল খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো মিশর ও ইথিওপিয়ার মতো দেশে বিনিয়োগের সুযোগ দেখছে।
বাংলাদেশের শক্তিশালী পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্প এসব বিনিয়োগকারীর জন্য আকর্ষণীয় হতে পারে। তবে মূল চ্যালেঞ্জ হলো সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের কাছে বাংলাদেশের সুযোগ তুলে ধরা।
নতুন প্রণোদনা ব্যবস্থা সেই যোগাযোগের ঘাটতি পূরণ করার চেষ্টা করছে। সরকারের ধারণা, বিদেশে থাকা বাংলাদেশিরা স্থানীয় দূতাবাস বা প্রচলিত প্রচারণার চেয়ে অনেক দ্রুত ও কার্যকরভাবে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের কাছে পৌঁছাতে পারবেন।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অর্থনৈতিক প্রণোদনা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয়। বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনের জন্য ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন, নীতির স্থিতিশীলতা, দ্রুত অনুমোদন ব্যবস্থা, অবকাঠামোগত সুবিধা এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের বড় বাজার, তরুণ শ্রমশক্তি, শিল্প সক্ষমতা এবং ভৌগোলিক অবস্থান বিদেশি বিনিয়োগের জন্য বড় সুবিধা হতে পারে। এখন নতুন উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে কতটা কার্যকরভাবে আন্তর্জাতিক যোগাযোগকে প্রকৃত বিনিয়োগে রূপান্তর করা যায় তার ওপর।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক যদি নতুন শিল্প, প্রযুক্তি ও মূলধন দেশে আনতে পারে, তাহলে এই উদ্যোগ শুধু বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াবে না, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

