আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে নতুন করে বড় অঙ্কের ঋণ পেতে বাংলাদেশকে চারটি ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হতে পারে। ক্ষেত্রগুলো হলো রাজস্ব আদায় বাড়ানো, ব্যাংক খাতের সংস্কার, ভর্তুকি কমিয়ে যৌক্তিক পর্যায়ে আনা এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানো। সরকার নতুন কর্মসূচির আওতায় ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি ডলার ঋণ চায়। এর আগে চলমান কর্মসূচির ষষ্ঠ কিস্তি ছাড়ের প্রশ্নও সামনে আছে। তাই অক্টোবরের আলোচনাকে নতুন ঋণের জন্য বাংলাদেশের প্রথম বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আগামী ২৯ অক্টোবর ঢাকায় আসছে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল। প্রায় দুই সপ্তাহের সফরে তারা দেশের অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করবে। একই সঙ্গে আগের পাঁচ কিস্তির শর্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতিও যাচাই করা হবে। এর আগে ১৩ থেকে ১৭ অক্টোবর ওয়াশিংটনে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা হবে। সেখানে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে বাংলাদেশের।
প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে থাকবেন আইএমএফের উন্নয়ন সামষ্টিক অর্থনীতি বিভাগের প্রধান ক্রিস পাপাজিও। তাঁরা বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বিদ্যুৎ বিভাগ এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে জানা গেছে। এই সফরের পর্যালোচনার ভিত্তিতেই ষষ্ঠ কিস্তি ছাড়ের সিদ্ধান্ত আসতে পারে। ফলে সরকারের সামনে এখন একসঙ্গে দুটি লক্ষ্য। একদিকে চলমান কর্মসূচির কিস্তি নিশ্চিত করা, অন্যদিকে নতুন কর্মসূচির জন্য আইএমএফকে রাজি করানো।
প্রথম চ্যালেঞ্জ রাজস্ব আদায়। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরেই কম। এতে সরকারের ব্যয়ের সক্ষমতা বাড়ছে না, আর বাজেট ঘাটতি ও সরকারি ঋণের চাপ বাড়ছে। আইএমএফের সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও কম রাজস্ব আহরণকে অর্থনীতির অন্যতম বড় দুর্বলতা বলা হয়েছে। সংস্থাটির মতে, রাজস্ব না বাড়লে সামাজিক সুরক্ষা, উন্নয়ন ও জনসেবায় প্রয়োজনীয় ব্যয় বাড়ানো সম্ভব হবে না। এবারের আলোচনায় এনবিআরের আদায়ের অগ্রগতি, করের আওতা বাড়ানো, কর প্রশাসনের সংস্কার এবং রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর পরিকল্পনা জানতে চাইতে পারে আইএমএফ। সরকারের জন্য এটি জটিল সমীকরণ। অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে ব্যয় বাড়ানো দরকার, কিন্তু পর্যাপ্ত রাজস্ব না থাকায় সেই ব্যয় মেটানোর সামর্থ্য সীমিত।
দ্বিতীয় বড় বিষয় ব্যাংক খাতের সংস্কার। খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংক, মূলধন ঘাটতি, তারল্য সংকট ও সুশাসনের অভাব মিলিয়ে এ খাত এখনো অর্থনীতির বড় ঝুঁকি। জুলাইয়ে বাংলাদেশ সফর শেষে আইএমএফ জানিয়েছিল, ব্যাংকিং খাতে চাপ এখনো বেশি এবং পুনর্গঠনে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও সমন্বিত কৌশল দরকার। এবার সংস্থাটি শুধু ঘোষণা নয়, বাস্তব অগ্রগতি দেখতে চাইতে পারে। আলোচনায় আসতে পারে দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণ কমানো, মূলধন বাড়ানো এবং পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা। অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক খাত দুর্বল থাকলে নতুন ঋণের অর্থও কাঙ্ক্ষিতভাবে কাজে লাগানো কঠিন হবে। কারণ তখন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়।
তৃতীয় বিষয় ভর্তুকি। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দামের অস্থিরতা, আমদানি ব্যয় এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের খরচ মিলিয়ে ভর্তুকির চাপ বেড়েছে। কোন খাতে কত ভর্তুকি যাচ্ছে এবং তা কীভাবে যৌক্তিক পর্যায়ে আনা যায়, সে বিষয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে। ইতিমধ্যে সরকার ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম বাড়িয়েছে। সরকারের ব্যাখ্যা, আন্তর্জাতিক বাজার, পরিবহন ও বিমা ব্যয় এবং ভর্তুকির চাপ বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকার বলছে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো আইএমএফের সরাসরি কোনো শর্ত নয়। তবে নতুন কর্মসূচিতে জ্বালানির মূল্য সমন্বয়, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম এবং ভর্তুকির পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হতে পারে। ফলে নতুন ঋণের সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে যেতে পারে।
চতুর্থ পরীক্ষা সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বিনিয়োগ, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ ও ধীর প্রবৃদ্ধিতে অর্থনীতি এখনো চ্যালেঞ্জের মধ্যে আছে। বিশেষ করে খাদ্য ও জ্বালানির দাম সাধারণ মানুষের খরচ বাড়িয়েছে। আইএমএফের সাম্প্রতিক পূর্বাভাসে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নামতে পারে বলে বলা হয়েছে। সংস্কারে গতি না এলে মধ্যমেয়াদে প্রবৃদ্ধি আরও কমার ঝুঁকির কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি। তাই নতুন কর্মসূচিতে শুধু ঋণের অঙ্ক নয়, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রিজার্ভ শক্তিশালী করা, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা এবং প্রবৃদ্ধি ফেরানোর পরিকল্পনাও গুরুত্ব পেতে পারে।
নতুন ঋণ কর্মসূচির প্রস্তুতি নিচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সামষ্টিক অর্থনীতি বিভাগ। সম্ভাব্য কাঠামোতে রাজস্ব আদায়, ব্যাংক খাতের সংস্কার, ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনা গুরুত্ব পাবে। সরকারের লক্ষ্য ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন ঋণচুক্তি চূড়ান্ত করা। আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ হলে আগামী বছরের শুরুতে প্রথম কিস্তি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।
আইএমএফের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকেও নতুন অর্থায়ন পেতে চেষ্টা করছে সরকার। বাজেট সহায়তার পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য ও সার আমদানি, ব্যাংক খাত পুনর্গঠন, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান ও জলবায়ু মোকাবিলায় অর্থায়নের প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে। বার্ষিক সভায় দুই সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। সেখানে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, অর্থায়নের প্রয়োজন ও সংস্কার পরিকল্পনা তুলে ধরার কথা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, ঋণ সাময়িক স্বস্তি দিলেও অর্থনীতির মৌলিক দুর্বলতা দূর করতে পারে না। নতুন ঋণ বৈদেশিক মুদ্রার চাপ ও বাজেট ব্যবস্থাপনায় কিছুটা সুবিধা দেবে। কিন্তু টেকসই সমাধানের জন্য কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, নতুন ঋণের অর্থ কোন খাতে ব্যবহার হবে এবং রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত কীভাবে বাড়ানো হবে, সে বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকতে হবে। সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, নতুন কর্মসূচি প্রয়োজনীয় সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে শুধু ঋণ পাওয়ার জন্য নয়, দেশের নিজস্ব প্রয়োজনেই রাজস্ব, ব্যাংকিং ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সংস্কার করতে হবে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সামনে প্রশ্ন এখন শুধু ঋণ পাওয়ার নয়। ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি ডলারের নতুন ঋণের দরজা খুলতে অর্থনীতির কোন কোন ক্ষেত্রে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, সেটিই মূল প্রশ্ন। অক্টোবরের পর্যালোচনা সেই পরীক্ষার প্রথম ধাপ। এতে সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে নতুন কর্মসূচির পথ কতটা সহজ হবে।

