পদ্মা সেতু চালুর পর বরিশালের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এসেছে। পণ্য পরিবহন সহজ হয়েছে, নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। কিন্তু শিল্পের অন্যতম প্রধান ভিত্তি জ্বালানি সংকট এখনো কাটেনি। প্রাকৃতিক গ্যাসের পাইপলাইন না থাকা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাবে বরিশাল বিসিক শিল্পনগরীর অনেক কারখানা উৎপাদন চালিয়ে যেতে হিমশিম খাচ্ছে।
শিল্প উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, গ্যাসের অভাবে তাদের সিলিন্ডার গ্যাস ও ডিজেলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের মাসিক অতিরিক্ত ব্যয় কয়েক লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এর ফলে বিদ্যমান শিল্পগুলো যেমন চাপের মুখে পড়েছে, তেমনি নতুন শিল্প স্থাপনের আগ্রহও কমছে।
বরিশাল বিসিক শিল্পনগরীর বনরুটি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান প্রান্তজন অ্যাগ্রো অ্যান্ড ফুড প্রোডাক্টসের উৎপাদনের প্রধান যন্ত্র হলো ওভেন। এই যন্ত্র চালু রাখতে প্রতিষ্ঠানটিকে বিদ্যুতের পাশাপাশি বিকল্প হিসেবে সিলিন্ডার গ্যাস ও ডিজেল ব্যবহার করতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হয়, আবার সিলিন্ডার গ্যাসের সরবরাহে সমস্যা হলে উৎপাদন নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তৌহিদুল ইসলাম শাহাজাদা বলেন, কারখানা চালুর পর থেকেই উৎপাদন খরচ বেড়েছে। বিশেষ করে সিলিন্ডার গ্যাসের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে তাদের উৎপাদন ব্যয় অন্তত ২০ শতাংশ বেড়েছে। এর সঙ্গে ঘন ঘন লোডশেডিং উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও ব্যাহত করছে।
শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, বরিশাল বিসিকের প্রায় ৩০০ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাই একই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ না থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠানকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। উদ্যোক্তারা আশঙ্কা করছেন, বাড়তি খরচ নিয়ে উৎপাদন চালিয়ে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
বরিশাল বিসিকের অন্যতম বড় প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল বিস্কুট লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির মাসিক উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ৭ কোটি টাকার পণ্য। কারখানাটির সিনিয়র ম্যানেজার মো. আবদুর রহমান জানান, প্রাকৃতিক গ্যাস না থাকায় তাদের প্রতি মাসে অতিরিক্ত প্রায় ৭০ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস পাওয়া গেলে এই অতিরিক্ত ব্যয় ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকায় নামিয়ে আনা সম্ভব।
বরিশাল বিসিক শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি মো. আলমগীর হোসেন আলম বলেন, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যাও শিল্প খাতের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। গ্যাস ও বিদ্যুতের সমস্যা সমাধান না হলে বরিশালে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করাও কঠিন হবে।
সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ এস এম মিজানুর রহমান অহিদ বলেন, বরিশাল বিসিকে বড় ও মাঝারি শিল্প গড়ে না ওঠার অন্যতম কারণ হলো গ্যাস সংকট। গ্যাস সরবরাহ না থাকায় তিনটি তৈরি পোশাক কারখানার জন্য প্লট বরাদ্দ নেওয়া হলেও এখনো সেগুলো চালু করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহও শিল্পনগরীর বড় সমস্যা। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। যদিও শিল্পনগরীর জন্য একটি উপকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে এবং আলাদা বিদ্যুৎ ফিডার চালুর আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, তবে তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বরিশাল বিসিক শিল্পনগরীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ৮ হাজার ৩২০ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। এর মধ্যে নারী কর্মী রয়েছেন ৪ হাজার ৫৭৮ জন এবং পুরুষ কর্মী ৩ হাজার ৭৪২ জন। শিল্পনগরীতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৮৯৭ কোটি ৪২ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
এখানে খাদ্য ও খাদ্যজাত পণ্যের ৫৪টি, বস্ত্র ও বস্ত্রজাত পণ্যের ১৯টি, প্রকৌশল খাতের ২২টি, বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিকসের ৬টি, রাসায়নিক খাতের ৩৬টি, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের ৬টি, মুদ্রণ ও প্যাকেজিংয়ের ১২টি, বনজ পণ্যের ১১টি এবং অন্যান্য খাতের ১৩টি শিল্প ইউনিট উৎপাদনে রয়েছে।
১৯৬০ সালে ১৩১ দশমিক ৬১ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত বরিশাল বিসিক শিল্পনগরীতে মোট ৫৩০টি প্লট রয়েছে। এর মধ্যে পুরোনো অংশে ৩৯৭টি এবং নতুন অংশে ১৩৩টি উন্নত প্লট রয়েছে। বর্তমানে ১৭৭টি শিল্প ইউনিটের নামে ৪১৮টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো ১১২টি প্লট বরাদ্দের অপেক্ষায় রয়েছে।
বিসিক কর্মকর্তারা বলছেন, গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল নয় এমন শিল্পের জন্য বরিশাল বিসিকে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং, প্রিন্টিং, প্রকৌশল ও নিটওয়্যার খাতে বড় শিল্প গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে।
বরিশাল বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা মো. গোলাম রসুল রাসেল বলেন, কয়েকটি প্রতিষ্ঠান প্লট নিতে আগ্রহ দেখিয়েছে। কেমিক্যাল, রেফকো ও ফুটওয়্যারসহ বিভিন্ন খাতের উদ্যোক্তারা বিনিয়োগের বিষয়ে আগ্রহী। তবে গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল শিল্পের ক্ষেত্রে বড় বাধা রয়ে গেছে।
বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক হাফিজুর রহমান হিরা বলেন, পদ্মা সেতুর কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থায় যে উন্নয়ন হয়েছে, তার পূর্ণ সুফল পেতে হলে শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিশ্চিত করতে হবে। পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করা গেলে বরিশালে নতুন শিল্প স্থাপনের সুযোগ বাড়বে।
তিনি বলেন, বর্তমানে সিলিন্ডার গ্যাস ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করে উৎপাদন চালাতে গিয়ে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে বরিশালে আনা গেলে শিল্পায়নের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে এবং বাড়তে পারে কর্মসংস্থানের সুযোগ।
বরিশাল বিসিকের বর্তমান চিত্রে একদিকে রয়েছে প্রায় ৯০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ ও ৮ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান, অন্যদিকে রয়েছে জ্বালানি সংকট ও অব্যবহৃত ১১২টি প্লট। যোগাযোগ ব্যবস্থার বড় বাধা দূর হলেও শিল্পের মূল চালিকাশক্তি গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট এখনো কাটেনি।
বিসিক জেলা কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক মো. আব্দুল্লাহ বলেন, বরিশাল বিসিকে বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠার পেছনে কয়েকটি সমস্যা রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো গ্যাস সংকট। পাশাপাশি ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং উৎপাদন খরচ বাড়ছে। তিনি জানান, সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়ে জানানো হবে।
বরিশালের শিল্পায়নের সম্ভাবনা থাকলেও এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—যোগাযোগের উন্নয়নের পর শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি অবকাঠামো কবে নিশ্চিত হবে। কারণ টেকসই শিল্পায়নের জন্য শুধু রাস্তা ও যোগাযোগ নয়, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

