চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে দেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাত বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ বছর সেপ্টেম্বরে বিদেশে যাওয়ার ছাড়পত্র পাওয়া কর্মীর সংখ্যা প্রায় ২৯ শতাংশ কমেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, মালয়েশিয়া-ওমান-বাহরাইনের মতো বড় শ্রমবাজারগুলো বন্ধ বা সীমিত থাকা এবং নতুন শ্রমবাজার তৈরিতে ব্যর্থতাই এর মূল কারণ। জাতীয় দৈনিক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের (টিবিএস) প্রকাশিত একটি বিশদ প্রতিবেদন থেকে জনশক্তি রপ্তানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহের এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যের ভিত্তিতে টিবিএস জানায়, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে বিদেশে কাজ করার জন্য মোট ৭০ হাজার ৩০৪ জন কর্মী ছাড়পত্র পেয়েছেন, যা গত বছরের সেপ্টেম্বরে ছিল ৯৯ হাজার ২৪ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কর্মী যাওয়া কমেছে ২৮ হাজার ৭২০ জন।
তবে আশার দিক হলো, আগস্ট মাসের (৬২,৯২৪ জন) তুলনায় সেপ্টেম্বরে কর্মী যাওয়া ১১.৭ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি হিসাবে পরিস্থিতি বেশ নেতিবাচক। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ থেকে বিদেশে গেছেন ৫ লাখ ৬৯ হাজার ৯৭৯ জন কর্মী, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩২ শতাংশ বা ২ লাখ ৬৮ হাজার ৯১৩ জন কম।
প্রতিকূল পরিস্থিতির মাঝেও বাংলাদেশি কর্মীদের শীর্ষ গন্তব্য হিসেবে প্রথম স্থানে রয়েছে সৌদি আরব (৩২,৯১৫ জন)। এরপর ক্রমান্বয়ে রয়েছে সিঙ্গাপুর, কাতার, মালদ্বীপ, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত। অন্যদিকে ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে পর্তুগাল ও ইতালিতে কর্মী যাওয়ার হার কিছুটা বেড়েছে।
জনশক্তি রপ্তানি কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতাকেই দায়ী করতে নারাজ বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অভ ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব টিপু সুলতানের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চল ও মালয়েশিয়ায় কাজের সুযোগ কমে এলেও নতুন বাজার তৈরিতে বাংলাদেশ পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, ব্রুনাই ও জর্ডানের মতো সম্ভাবনাময় বাজারগুলো সরকারি সংস্থা বোয়েসেলের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যাদের বেসরকারি খাতের মতো ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির সক্ষমতা নেই। অন্যদিকে সিঙ্গাপুরের বাজারও কয়েকটি নির্দিষ্ট এজেন্সির হাতে জিম্মি। শ্রমবাজারগুলো সিন্ডিকেটমুক্ত করে সব যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য উন্মুক্ত করার তাগিদ দেন তিনি।
পরিস্থিতি উত্তরণে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নূর জানিয়েছেন, সরকারের বিশেষ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অধীনে আগামী পাঁচ বছরে ১ কোটি কর্মক্ষম মানুষকে বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। বন্ধ থাকা বাজারগুলো ফের চালু করতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশে সমঝোতা স্মারকের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে এবং কর্মীদের কারিগরি ও ভাষাগত দক্ষতা বাড়াতে কাজ চলছে।
তবে শ্রমবাজারের এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, সেপ্টেম্বরে দেশে ২.৭৭ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা গত ১১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। ব্যাংকারদের ধারণা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং হুন্ডি বাজারের পুনরায় চাঙা হয়ে ওঠাই প্রবাসী আয় কমার অন্যতম প্রধান কারণ।

