বাংলাদেশে বর্তমানে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত। রাজপথে নেই হরতাল, অবরোধ বা বড় ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি। স্বাভাবিকভাবেই এমন পরিস্থিতিতে সরকারি উন্নয়ন কার্যক্রমে গতি বাড়ার প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সুফল উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত হচ্ছে না। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাস্তবায়নের হার নেমে এসেছে মাত্র ১ দশমিক ৮৫ শতাংশে, যা গত পাঁচ অর্থবছরের একই সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন।
পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের এডিপির মোট আকার ৩ লাখ ৮ হাজার ৯২৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে জুলাই ও আগস্ট দুই মাসে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৫ হাজার ৭০৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। অথচ এর আগের বছরগুলোতে একই সময়ে এডিপি বাস্তবায়নের হার তুলনামূলক বেশি ছিল। ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বাস্তবায়ন হার ছিল ৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং গত অর্থবছরে ছিল ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে অর্থবছরের শুরুতেই উন্নয়ন ব্যয়ের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
এডিপি বাস্তবায়নের এই ধীরগতি শুধু সরকারি হিসাবের একটি সংখ্যা নয়; এর সঙ্গে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমও জড়িত। উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ ব্যয় হলে নির্মাণ খাত, শ্রমবাজার, পরিবহন, স্থানীয় ব্যবসা এবং নির্মাণসামগ্রীর চাহিদা বাড়ে। সরকারি বিনিয়োগ অনেক সময় বেসরকারি বিনিয়োগের দুর্বলতা কাটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু উন্নয়ন ব্যয় স্থবির হলে অর্থনীতিতে চাহিদা ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষ করে বর্তমান সময়ে, যখন বেসরকারি বিনিয়োগে গতি কম এবং অর্থনৈতিক চাপ রয়েছে, তখন সরকারি উন্নয়ন ব্যয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করতে পারত। কিন্তু এডিপি বাস্তবায়নের ধীরগতি সেই সম্ভাবনাকে সীমিত করছে।
এডিপি বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে বৈদেশিক অর্থায়ন ব্যবহারে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ৪৯ কোটি টাকা, যা বরাদ্দের ২ দশমিক ১৩ শতাংশ। অন্যদিকে প্রকল্প ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তা থেকে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা, যা সংশ্লিষ্ট বরাদ্দের মাত্র ১ দশমিক ২২ শতাংশ। সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নে ব্যয়ের হার তুলনামূলক বেশি হলেও তা সামগ্রিক চিত্র পরিবর্তন করতে পারেনি।
বৈদেশিক অর্থায়ননির্ভর প্রকল্পগুলো ধীরগতির হওয়ার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। দাতা সংস্থার শর্ত, অর্থছাড়ের দীর্ঘ প্রক্রিয়া, প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন, নতুন সরকারের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগা—সবকিছু মিলিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব তৈরি হচ্ছে।
চলতি অর্থবছরের এডিপিতেও বড় একটি অংশ নির্ভর করছে কয়েকটি মেগা প্রকল্পের ওপর। প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ মোট এডিপির প্রায় সাড়ে ১২ শতাংশ বরাদ্দ রয়েছে পাঁচটি বড় প্রকল্পে। এর মধ্যে রয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেলের দুটি লাইন, মাতারবাড়ী বন্দর এবং বিদ্যুৎ বিতরণ অবকাঠামো। শুধু রূপপুর প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৫ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা।
এর ফলে বড় প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি ধীর হলে পুরো এডিপি বাস্তবায়নের ওপর তার প্রভাব পড়ে। উন্নয়ন বাজেটের একটি কাঠামোগত দুর্বলতাও এখানে স্পষ্ট হয়—বড় অঙ্কের অর্থ কয়েকটি প্রকল্পে কেন্দ্রীভূত থাকায় সেগুলোর গতি কমে গেলে সামগ্রিক উন্নয়ন ব্যয়ও ধীর হয়ে যায়।
অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প বাস্তবায়নের হার মাত্র ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ। সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগে এই হার ২ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং বিদ্যুৎ বিভাগে ২ দশমিক ১৩ শতাংশ। যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে এই ধীরগতি ভবিষ্যতের উৎপাদন সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, দরপত্র প্রক্রিয়া, ঠিকাদার নির্বাচন, ভূমি অধিগ্রহণ, পরিবেশগত অনুমোদন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের দীর্ঘসূত্রতা অনেক প্রকল্পকে পিছিয়ে দিচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, উন্নয়নের বাধা কি এখন আর রাজনৈতিক নয়, বরং প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরেই তৈরি হচ্ছে?
আগের বছরগুলোতে উন্নয়ন প্রকল্প ধীর হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে রাজনৈতিক অস্থিরতাকে সামনে আনা হতো। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই ব্যাখ্যা পুরোপুরি কার্যকর নয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এবার মূল সমস্যা হচ্ছে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব, প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন, অগ্রাধিকার নির্ধারণে সময়ক্ষেপণ এবং অর্থ ছাড়ের জটিলতা।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আগের সরকারের নেওয়া অনেক প্রকল্প পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। কোন প্রকল্প চালু থাকবে, কোনটি বাতিল হবে কিংবা কোনটির গুরুত্ব কমবে—এসব সিদ্ধান্ত এখনো অনেক ক্ষেত্রে চূড়ান্ত হয়নি। এর ফলে কিছু প্রকল্পে অর্থ ছাড় ও বাস্তবায়ন কার্যক্রম ধীর হয়ে গেছে।
অবশ্য প্রকল্প যাচাই-বাছাই একটি প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া হতে পারে। কারণ অপ্রয়োজনীয় বা রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া প্রকল্প বাতিল করলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য সুফল পাওয়া সম্ভব। কিন্তু এই প্রক্রিয়া যদি দীর্ঘ হয়, তাহলে ভালো ও প্রয়োজনীয় প্রকল্পও ক্ষতির মুখে পড়ে।
বৈদেশিক অর্থায়ননির্ভর প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। আগের সরকারের সময় নেওয়া কিছু প্রকল্প ও ঋণ চুক্তি নতুন করে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে অর্থায়নের বিকল্প খুঁজতে হচ্ছে। ফলে প্রকল্প কাঠামো পরিবর্তন, নতুন আলোচনা এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ার কারণে বাস্তবায়নের গতি কমছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অর্থবছরের শুরুতে সাধারণত এডিপি বাস্তবায়ন কিছুটা ধীর থাকে। তবে এবার এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ এবং আগের সরকারের প্রকল্পগুলোর পুনর্মূল্যায়ন। অনেক প্রকল্পের অগ্রাধিকার এখনো চূড়ান্ত না হওয়ায় বাস্তবায়নে গতি আসছে না।
তিনি আরও মনে করেন, সরকারের আর্থিক সক্ষমতার চাপ, জ্বালানি খাতে ব্যয় বৃদ্ধি এবং আগের সরকারের নেওয়া প্রকল্পগুলোর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতা পরিবর্তনও বর্তমান পরিস্থিতিতে ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশের উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নে দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা হলো বছরের শুরুতে ধীরগতি এবং শেষ দিকে তাড়াহুড়ো। অর্থবছরের শেষ দিকে বরাদ্দ ব্যয়ের চাপ তৈরি হলে অনেক সময় কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হয়। চলতি অর্থবছরের শুরুতেই যদি বড় ঘাটতি তৈরি হয়, তাহলে বছরের শেষ দিকে একই ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—শুধু এডিপির আকার বড় করলেই উন্নয়ন নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্প নির্বাচন, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং জবাবদিহিমূলক প্রকল্প ব্যবস্থাপনা।
সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো চলমান প্রকল্পগুলোকে দ্রুত অগ্রাধিকার অনুযায়ী ভাগ করা, বৈদেশিক অর্থায়নের বাধা দূর করা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রশাসনিক জটিলতা কমানো। কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ঝুলিয়ে না রেখে প্রয়োজনীয় প্রকল্প দ্রুত এগিয়ে নেওয়াই হতে পারে কার্যকর পথ।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি একাই উন্নয়নের গতি নিশ্চিত করতে পারে না। প্রয়োজন দক্ষ প্রতিষ্ঠান, দ্রুত সিদ্ধান্ত, স্বচ্ছতা এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসের এডিপি বাস্তবায়নের চিত্র দেখিয়ে দিচ্ছে, রাজপথ শান্ত থাকলেই উন্নয়নের চাকা নিজে থেকে ঘুরতে শুরু করে না।
এখন মূল প্রশ্ন হলো—উন্নয়নের বাধা কোথায়? সিদ্ধান্ত গ্রহণে, প্রশাসনিক জটিলতায়, অর্থায়নের সংকটে নাকি প্রকল্প নির্বাচনের কাঠামোগত দুর্বলতায়? এই প্রশ্নের দ্রুত সমাধান করা জরুরি। কারণ এডিপির অর্থ শুধু বাজেটের হিসাব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সক্ষমতা।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পর এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো উন্নয়নের প্রশাসনিক স্থবিরতা দূর করা।

