বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করতে ৩০ কোটি মার্কিন ডলার অর্থায়ন করবে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা। জরুরি খাদ্য নিরাপত্তা সহায়তা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সোমবার, ৫ অক্টোবর একটি অর্থায়ন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। দেশের কৃষি উৎপাদন সচল রাখা, বিশেষ করে রোপণ মৌসুমে প্রয়োজনীয় সার সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ক্ষুদ্র কৃষকদের সহায়তা দেওয়াই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত। অর্থাৎ এক বছরের এই কর্মসূচির মাধ্যমে এমন একটি সময়ে কৃষিখাতকে সহায়তা দেওয়া হবে, যখন উৎপাদন ব্যয়, উপকরণের সহজলভ্যতা এবং খাদ্য সরবরাহের স্থিতিশীলতা অর্থনীতির জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
চুক্তিতে বাংলাদেশের পক্ষে স্বাক্ষর করেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী। বিশ্বব্যাংকের পক্ষে স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য সংস্থাটির বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেসমে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে অর্থ বিভাগ। এ কাজে সমন্বয় করবে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন। ফলে অর্থায়নের পাশাপাশি সার সংগ্রহ, সরবরাহ এবং কৃষকের কাছে প্রয়োজনীয় উপকরণ পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ভূমিকা থাকবে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় অবদান রাখা। বিশেষ করে রোপণ মৌসুমে যোগ্য সার পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে ক্ষুদ্র কৃষকরা, যাদের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি বা সময়মতো সার না পাওয়ার কারণে তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিতে পড়তে হয়।
বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনে সারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধানসহ প্রধান খাদ্যশস্যের ফলন ধরে রাখতে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও অন্যান্য সারের নিয়মিত সরবরাহ প্রয়োজন। সারের ঘাটতি বা সরবরাহে বিলম্ব হলে তার প্রভাব সরাসরি চাষাবাদে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে কৃষক নির্ধারিত সময়ে জমি প্রস্তুত করেও উপকরণ সংকটে উৎপাদনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেন না। এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে তা শুধু কৃষকের আয় নয়, সামগ্রিক খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকেও চাপের মুখে ফেলতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে ৩০ কোটি ডলারের অর্থায়নকে শুধু একটি ঋণ প্রকল্প হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে কৃষি উৎপাদনের ধারাবাহিকতা, খাদ্য সরবরাহ এবং বাজারে মূল্যস্থিতিশীলতার প্রশ্ন। উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সার সময়মতো পাওয়া গেলে কৃষকের অনিশ্চয়তা কমে এবং মৌসুমি উৎপাদন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ হয়।
ঋণটির আর্থিক শর্তও দীর্ঘমেয়াদি। উত্তোলিত ঋণের স্থিতির ওপর বার্ষিক সুদের হার হবে ১ দশমিক ৫ শতাংশ। অপরদিকে, অনুত্তোলিত অর্থের ওপর বার্ষিক সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ অঙ্গীকার ফি রাখার বিধান রয়েছে।
তবে বাংলাদেশকে বহু বছর ধরে এই অঙ্গীকার ফি থেকে অব্যাহতি দিয়ে আসছে বিশ্বব্যাংক। চলতি অর্থবছরেও এই সুবিধা বহাল রয়েছে। ফলে ঋণের ঘোষিত কাঠামোর তুলনায় বাস্তবে বাংলাদেশের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ কিছুটা কম থাকবে।
ঋণের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ বছর। এর মধ্যে প্রথম পাঁচ বছর থাকবে রেয়াতকাল। দীর্ঘ পরিশোধকাল এবং পাঁচ বছরের রেয়াত সুবিধা সরকারের জন্য অর্থায়ন ব্যবস্থাপনায় বাড়তি সময় তৈরি করবে। সাধারণত উন্নয়ন সহযোগীদের এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উদ্দেশ্য থাকে তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক চাপ কমিয়ে প্রয়োজনীয় খাতে বিনিয়োগ নিশ্চিত করা।
খাদ্য নিরাপত্তা এখন শুধু কৃষি উৎপাদনের বিষয় নয়; এর সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, আমদানি ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজারে সারের মূল্য, জ্বালানি ব্যয় এবং সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতাও জড়িত। বিশেষ করে কৃষি উপকরণের দাম বেড়ে গেলে ক্ষুদ্র কৃষকরা দ্রুত সংকটে পড়েন। বড় কৃষকের তুলনায় তাদের সঞ্চয় ও বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ কম থাকে।
এ কারণে প্রকল্পে ক্ষুদ্র কৃষকদের গুরুত্ব দেওয়া বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রয়োজনীয় সার সময়মতো পাওয়া গেলে তারা জমির উৎপাদনক্ষমতা ধরে রাখতে পারবেন এবং নির্ধারিত মৌসুমে চাষাবাদ চালিয়ে যেতে পারবেন। এর ইতিবাচক প্রভাব উৎপাদনের পরিমাণ ছাড়াও স্থানীয় বাজার, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে পড়তে পারে।
এই অর্থায়ন বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগিতার ধারাবাহিক অংশ। বিশ্বব্যাংক বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বহুপক্ষীয় উন্নয়ন অংশীদার এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন থেকে শুরু করে অবকাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও জ্বালানি খাত পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্থায়ন করে আসছে।
নতুন এই সহায়তার বিশেষ দিক হলো, এটি সরাসরি খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। সাধারণ উন্নয়ন প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনে গুরুত্ব দেওয়া হলেও এই প্রকল্পের লক্ষ্য তুলনামূলকভাবে তাৎক্ষণিক। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সার সরবরাহ নিশ্চিত করে চলমান কৃষি মৌসুমকে সহায়তা করা।
তবে প্রকল্পের সাফল্য কেবল অর্থ পাওয়ার ওপর নির্ভর করবে না। সার আমদানি বা সংগ্রহের পর তা সঠিক সময়ে যথাযথ এলাকায় পৌঁছানো, কৃষকের প্রকৃত চাহিদা নির্ধারণ এবং বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হবে। প্রয়োজনীয় অর্থ থাকলেও সরবরাহ ব্যবস্থায় জটিলতা তৈরি হলে কৃষক প্রত্যাশিত সুফল নাও পেতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি উপকরণ ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কৃষক যদি মৌসুমের উপযুক্ত সময়ে সার না পান, তাহলে পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত সরবরাহ থাকলেও উৎপাদনের ক্ষতি পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হয় না। তাই এই প্রকল্পে সময়মতো বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় বিষয়গুলোর একটি হয়ে উঠবে।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দামের ওঠানামা এবং আমদানি ব্যয়ের পরিবর্তনও প্রকল্পের কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে গেলে একই পরিমাণ অর্থে তুলনামূলক কম সার কেনা সম্ভব হবে। বিপরীতে দাম স্থিতিশীল বা নিম্নমুখী থাকলে প্রকল্পের অর্থ দিয়ে বেশি পরিমাণ সরবরাহ নিশ্চিত করা সহজ হতে পারে।
বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে খাদ্য উৎপাদনে সামান্য ব্যাঘাতও দ্রুত বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে। চাল, শাকসবজি বা অন্যান্য কৃষিপণ্যের উৎপাদন কমে গেলে সরবরাহ সংকটের পাশাপাশি ভোক্তা পর্যায়ে দাম বাড়ার চাপ তৈরি হয়। এ কারণে কৃষি উপকরণের ধারাবাহিক সরবরাহ শুধু কৃষকের স্বার্থ নয়, সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সঙ্গেও পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত।
এই বাস্তবতায় বিশ্বব্যাংকের ৩০ কোটি ডলারের অর্থায়ন সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ব্যবস্থা হতে পারে। বিশেষ করে প্রকল্পের অর্থ যদি পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা হয় এবং ক্ষুদ্র কৃষকদের কাছে প্রয়োজনীয় সার সময়মতো পৌঁছানো সম্ভব হয়, তাহলে তা স্বল্পমেয়াদে খাদ্য উৎপাদনের ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে ৫ অক্টোবর স্বাক্ষরিত এই অর্থায়ন চুক্তি বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তবায়নকালে মূল নজর থাকবে সার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, ক্ষুদ্র কৃষকদের উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখা এবং খাদ্যশস্য উৎপাদনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার ওপর।
৩০ কোটি ডলারের এই অর্থায়নের প্রকৃত সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে এর বাস্তব প্রয়োগের ওপর। কৃষকের প্রয়োজনের সময়ে প্রয়োজনীয় সার পৌঁছানো গেলে এটি খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষায় কার্যকর সহায়তা হতে পারে। অন্যদিকে, সরবরাহ বা বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে বড় অঙ্কের অর্থায়ন সত্ত্বেও প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হতে পারে।

