একসময় বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের দ্রুত বর্ধনশীল বাজারগুলোর একটি ছিল রাশিয়া। বিশেষ করে সোয়েটার ও অন্যান্য নিট পোশাকের ব্যাপক চাহিদার কারণে দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি দ্রুত বাড়ছিল। এমনকি রাশিয়ায় বছরে ১০০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানির লক্ষ্যও দেখছিলেন দেশের ব্যবসায়ীরা। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, অর্থ পরিশোধের জটিলতা এবং পণ্য পরিবহনের পথ কঠিন হয়ে পড়ায় সেই সম্ভাবনাময় বাজার এখন ক্রমেই বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগে দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি দ্রুত বাড়ছিল। রাশিয়ায় বাংলাদেশ থেকে যাওয়া মোট পণ্যের ৯৫ শতাংশেরও বেশি ছিল তৈরি পোশাক। ফলে বাজারটি দেশের পোশাকশিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প গন্তব্য হয়ে উঠেছিল।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ রাশিয়ায় ৬৬ কোটি ৫৩ লাখ ১০ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিল। ২০২১-২২ অর্থবছরেও রপ্তানি ছিল ৬৩ কোটি ৮৩ লাখ ডলার। কিন্তু পরের অর্থবছর থেকেই পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। ধারাবাহিকভাবে কমতে কমতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাশিয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানি নেমে এসেছে ২৫ কোটি ৭২ লাখ ৬০ হাজার ডলারে।
অর্থাৎ যুদ্ধের আগের অবস্থানের তুলনায় রাশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি অর্ধেকেরও নিচে নেমে গেছে। অথচ যুদ্ধের আগে পোশাক ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা ছিল, রাশিয়ায় বার্ষিক পোশাক রপ্তানি একসময় ১০০ কোটি ডলারের সীমা অতিক্রম করবে।
রাশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের উত্থানের পেছনেও রয়েছে একটি ভিন্ন ইতিহাস। ২০১১ সালে তুরস্ক নিজেদের পোশাকশিল্পকে সুরক্ষা দিতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের ওপর ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ সুরক্ষা শুল্ক আরোপ করে। এর আগে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ মৌলিক পোশাক তুরস্কে যেত। তুরস্কের ব্যবসায়ীরা সেসব পোশাক নিজেদের নামে পুনরায় বাজারজাত করে রাশিয়ায় রপ্তানি করতেন।
উচ্চ শুল্ক আরোপের পর বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা তুরস্কের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি রাশিয়ার বাজারে পণ্য পাঠাতে শুরু করেন। এর ফলে ধীরে ধীরে রাশিয়ায় বাংলাদেশি পোশাকের শক্ত অবস্থান তৈরি হয়। প্রতিযোগিতামূলক দাম এবং তৈরি পোশাকের মানের কারণে রুশ ক্রেতাদের কাছেও বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা বাড়তে থাকে।
কিন্তু যুদ্ধ সেই বাণিজ্য কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনে দিয়েছে। বর্তমানে রাশিয়ায় পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হচ্ছে রপ্তানির অর্থ দেশে আনা। যুদ্ধের পর রাশিয়ার বেশ কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে আন্তর্জাতিক আন্তব্যাংক অর্থ স্থানান্তর ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। ফলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা রুশ ক্রেতাদের কাছ থেকে স্বাভাবিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অর্থ গ্রহণ করতে গিয়ে বড় ধরনের সমস্যায় পড়ছেন।
সমস্যা শুধু অর্থ লেনদেনেই সীমাবদ্ধ নয়। আগের মতো সরাসরি রাশিয়ায় পণ্য পাঠানোর সুযোগও সংকুচিত হয়েছে। রপ্তানিকারকদের এখন পোল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, বেলারুশ ও জার্মানির মতো দেশের মধ্য দিয়ে বিকল্প পথে পণ্য পাঠাতে হচ্ছে। এতে পরিবহন প্রক্রিয়া যেমন জটিল হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে খরচ ও ব্যবসায়িক ঝুঁকি।
দেশীয় পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ইয়াংফরএভার টেক্সটাইলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাজীব চৌধুরী জানিয়েছেন, যুদ্ধের আগে তিনি রাশিয়ায় ১০ লাখ ডলারের বেশি মূল্যের পোশাক রপ্তানি করতেন। কিন্তু অর্থ পাওয়ার সমস্যার কারণে শেষ পর্যন্ত তিনি দেশটিতে রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছেন।
এক রুশ ক্রেতার কাছে তার এক লাখ ডলারের পাওনা আদায় করতেই বড় ধরনের জটিলতায় পড়তে হয়েছিল। প্রায় তিন বছর আলোচনার পর অন্য একটি দেশের তৃতীয় পক্ষের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত ওই অর্থ পরিশোধ করা হয়।
এত সমস্যার পরও রাশিয়ার বাজারের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়নি বলে মনে করেন তিনি। প্রতিযোগিতামূলক দামের কারণে রাশিয়ায় ‘বাংলাদেশে তৈরি’ পোশাকের চাহিদা এখনো শক্তিশালী। কিন্তু পণ্য পাঠানো এবং অর্থ দেশে ফেরানোর নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা না থাকায় সেই চাহিদাকে ব্যবসায়িক সুযোগে রূপান্তর করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
কিছু বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান তৃতীয় দেশের মাধ্যমে রাশিয়ায় পণ্য পাঠানো এবং তুরস্কের লিরা বা চীনের ইউয়ানের মতো তৃতীয় দেশের মুদ্রায় অর্থ গ্রহণের চেষ্টা করছে। কিন্তু এই ব্যবস্থাতেও বড় ঝুঁকি রয়েছে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, নিষেধাজ্ঞাসংক্রান্ত নিয়মের আওতায় কোনো প্রতিষ্ঠান কালো তালিকাভুক্ত হলে তাদের আন্তর্জাতিক ব্যবসাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এনেছেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রুশ ব্যাংকের ওপর বিধিনিষেধের কারণে অর্থ গ্রহণ করতে না পারায় বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকদের রাশিয়ার ক্রেতাদের কাছে ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি পাওনা রয়েছে।
বিশেষ করে অনেক ছোট ও মাঝারি নিট পোশাক রপ্তানিকারক এখনো রাশিয়ার ক্রেতাদের কাছ থেকে ৩০ লাখ থেকে ৪০ লাখ ডলার পর্যন্ত পাওনা আদায় করতে পারেননি। একাধিকবার আলোচনা হলেও অনেক ক্ষেত্রে সেই অর্থ দেশে আনা সম্ভব হয়নি।
কিছু রপ্তানিকারক পোল্যান্ডের ক্রেতা প্রতিষ্ঠান এলপিপির মাধ্যমে রাশিয়ায় পাঠানো পণ্যের অর্থ পেতেও সমস্যায় পড়ছেন বলে জানিয়েছেন মোহাম্মদ হাতেম। ফলে রাশিয়ার বাজারে নতুন পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই সতর্কতা বেড়েছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান মনে করেন, রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর একাধিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাবেই সেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে। এ অবস্থায় দেশের পোশাক রপ্তানিকারকেরা বিকল্প বাজারের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন।
জাপান, তুরস্ক, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বাজার এখন বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানিকারকদের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এসব দেশে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বড় সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
তবে রাশিয়ার বাজারকে একেবারে ছেড়ে দিতে চান না ব্যবসায়ীরা। দেশটির বিশাল ভোক্তাবাজার এবং বাংলাদেশি পোশাকের বিদ্যমান চাহিদা বিবেচনায় যুদ্ধ শেষ হলে রাশিয়া আবারও বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি গন্তব্যে পরিণত হতে পারে বলে তাদের প্রত্যাশা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে রাশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের সংকট তাই চাহিদার অভাবের কারণে নয়। মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থ পরিশোধ, ব্যাংকিং যোগাযোগ, নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি এবং জটিল পরিবহন ব্যবস্থা। এসব বাধার কারণে একসময় ১০০ কোটি ডলারের স্বপ্ন দেখানো বাজারে এখন রপ্তানি ধরে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকদের আরও বেশি বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকতে হতে পারে।

