দীর্ঘ ১৭ বছর পর আবারও সরকারি সিকিউরিটিজ পুনঃক্রয়ের কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনা আরও ভারসাম্যপূর্ণ করা এবং বাজারে থাকা সরকারি সিকিউরিটিজের সংখ্যা কমানোর লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংক আগামী ৮ অক্টোবর দুই বছর মেয়াদি একটি ট্রেজারি বন্ড পুনঃক্রয়ের জন্য নিলাম আয়োজন করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সোমবার জারি করা বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, দায় ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের আওতায় এই নিলাম অনুষ্ঠিত হবে। দীর্ঘ বিরতির পর এমন উদ্যোগ দেশের সরকারি ঋণ ও বন্ডবাজার ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পুনঃক্রয়ের জন্য নির্ধারিত ট্রেজারি বন্ডটি ২০২৪ সালের ৬ নভেম্বর ইস্যু করা হয়েছিল। এর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৬ সালের ৬ নভেম্বর। অর্থাৎ মেয়াদপূর্তির প্রায় এক মাস আগেই সরকার বাজার থেকে বন্ডটি ফের কিনে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।
বন্ডটির বার্ষিক কুপন হার ১২ দশমিক ৩০ শতাংশ। বর্তমানে এর বকেয়া পরিমাণ প্রায় ৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা। তবে নিলামের মাধ্যমে এই পুরো অর্থের বন্ড পুনঃক্রয় করা হবে কি না, তা নির্ভর করবে জমা পড়া দর এবং নিলাম কমিটির সিদ্ধান্তের ওপর।
নিলামটি একাধিক মূল্যভিত্তিক বিপরীত নিলাম পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হবে। নিলাম হবে ৮ অক্টোবর এবং লেনদেন নিষ্পত্তির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ অক্টোবর ২০২৬।
প্রাথমিক ডিলার হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যাংকগুলো সরাসরি নিলামে অংশ নিতে পারবে। অন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান তাদের সংশ্লিষ্ট প্রাথমিক ডিলারের মাধ্যমে দর জমা দিতে পারবে। বাংলাদেশ ব্যাংকে চলতি হিসাব রয়েছে—এমন যোগ্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত ব্যবস্থার আওতায় অংশ নিতে পারবে।
ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক—উভয় ধরনের বিনিয়োগকারীর কাছেই যদি নির্ধারিত ট্রেজারি বন্ডটি থাকে, তারাও সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে পুনঃক্রয় প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
৮ অক্টোবর সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত আর্থিক বাজার অবকাঠামো ব্যবস্থার মাধ্যমে দর জমা দেওয়া যাবে। একই দিন দুপুর ২টায় নিলামের ফল প্রকাশ করার কথা রয়েছে।
প্রতিযোগিতামূলক এবং অপ্রতিযোগিতামূলক—দুই ধরনের দরই গ্রহণ করা হবে। অংশগ্রহণকারীদের দেওয়া প্রস্তাব বিবেচনা করে নিলাম কমিটি কোন দরে বন্ড পুনঃক্রয় করা হবে, তা নির্ধারণ করবে।
সফল দরদাতারা বন্ডের মূল্যের পাশাপাশি সর্বশেষ কুপন পরিশোধের তারিখ থেকে পুনঃক্রয় নিষ্পত্তির আগের দিন পর্যন্ত জমা হওয়া সুদও পাবেন। সফল অংশগ্রহণকারীদের প্রাপ্য মূল্য ও সুদ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বাংলাদেশ ব্যাংকে থাকা চলতি হিসাবের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হবে।
তবে নিলামে দর জমা দিলেই যে সরকার তা গ্রহণ করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নিলাম কমিটি কোনো দর গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করতে পারবে। প্রয়োজন মনে করলে কোনো কারণ না জানিয়েও পুরো নিলাম বাতিল করার ক্ষমতাও কমিটির হাতে থাকবে। নিলামসংক্রান্ত কোনো বিরোধ তৈরি হলে নিলাম কমিটির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
সরকারি সিকিউরিটিজ পুনঃক্রয়ের বিষয়টি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন লেনদেন থেকে কিছুটা দূরের মনে হলেও এটি সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সরকার যখন ট্রেজারি বন্ড ইস্যু করে, তখন মূলত বাজার থেকে ঋণ নেয়। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সেই বন্ডের একটি অংশ পুনঃক্রয় করা হলে সরকারের ভবিষ্যৎ দায়ের কাঠামো পরিবর্তিত হয় এবং বাজারে থাকা সিকিউরিটিজের পরিমাণও কমে আসে।
এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে সরকার তার ঋণের মেয়াদ, সুদ ব্যয় এবং পরিশোধের সময়সূচি আরও কার্যকরভাবে ব্যবস্থাপনার সুযোগ পেতে পারে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট বন্ডে বিনিয়োগ করা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান মেয়াদপূর্তির আগেই তাদের বিনিয়োগ নগদ অর্থে রূপান্তরের সুযোগ পাবে।
তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। বর্তমানে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ঋণের চাহিদা তুলনামূলক দুর্বল থাকলে বন্ড বিক্রি করে ব্যাংকের হাতে আসা অতিরিক্ত অর্থ কোথায় বিনিয়োগ হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের প্রধান নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই বিষয়টিই সামনে এনেছেন। তার প্রশ্ন, বন্ডধারী ব্যাংকগুলো পুনঃক্রয়ের মাধ্যমে অর্থ ফেরত পেলেও বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত থাকলে সেই অর্থ তারা কোথায় ব্যবহার করবে?
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে নিলামে প্রস্তাবিত মূল্য। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিজেদের আর্থিক অবস্থান ও বাজারের সুদহার বিবেচনা করে যে মূল্য চাইবে, তা সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। ফলে ৮ অক্টোবরের নিলামে কী ধরনের দর আসে এবং সরকার কতটা বন্ড পুনঃক্রয় করতে পারে, সেটি আর্থিক খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে উঠেছে।
১৭ বছর পর সরকারি সিকিউরিটিজ পুনঃক্রয় শুরুর সিদ্ধান্ত তাই শুধু একটি বন্ড নিলামের ঘটনা নয়। এটি সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনায় নতুন সক্রিয়তার ইঙ্গিতও বহন করছে। উদ্যোগটি কতটা কার্যকর হবে, তার প্রথম বাস্তব পরীক্ষা হবে আগামী ৮ অক্টোবরের নিলামে।

