নতুন দাম কার্যকরের আগেই নারায়ণগঞ্জের বাজারে এলপিজি সিলিন্ডারের সংকট ও অতিরিক্ত দামের অভিযোগ উঠেছে। সরকার ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে গ্রাহক পর্যায়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করলেও জেলার বিভিন্ন এলাকায় তা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকায়। শুধু দামই নয়, অনেক দোকানে সিলিন্ডারই পাওয়া যাচ্ছে না। গ্রাহকদের অভিযোগ, সরকার দাম ঠিক করে দিলেও বাজারে কার্যকর তদারকি নেই।
নারায়ণগঞ্জের কাশীপুরের হাজীপাড়া এলাকার বাসিন্দা মোক্তার হোসেন মঙ্গলবার আশপাশের অন্তত চারটি দোকান ঘুরেও ১২ কেজির সিলিন্ডার পাননি। শেষ পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে নগরীর গলাচিপা এলাকার এক খুচরা বিক্রেতার কাছ থেকে তিনি সেটি কিনেছেন ২ হাজার ৩০০ টাকায়। অথচ মাসখানেক আগে একই ওজনের সিলিন্ডার তিনি পেয়েছিলেন ১ হাজার ৮০০ টাকায়। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সিলিন্ডারই পাওয়া যায় না, আর সরকারি দামের হিসাব শুধু সরকারের কাছেই আছে; গ্রাহককে কিনতে হয় বেশি দামে।
গত রোববার এক বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে গ্রাহক পর্যায়ে বোতলজাত এলপিজির দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। নতুন দামে প্রতি কেজি এলপিজির মূল্য ১৫৩ টাকা ৬ পয়সা। সেই হিসাবে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের বাজারে এই দামের চেয়ে ১৬৩ থেকে ৫৬৩ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে। অন্যান্য ওজনের সিলিন্ডারও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশিতে কিনতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন গ্রাহকেরা।
নগরীর ভাষা সৈনিক সড়কের ফুটপাতে চায়ের দোকান চালান মো. ইমন। গত রোববার বিকেলে তিনি ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনেছেন ২ হাজার ৪০০ টাকায়। এক সপ্তাহ আগেও একই সিলিন্ডারের জন্য তাঁকে দিতে হয়েছিল ২ হাজার টাকা। অর্থাৎ এক সপ্তাহেই দাম বেড়েছে ৪০০ টাকা। ইমনের ভাষ্য, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। সরকার দাম বাড়াবে, এমন খবর শুনেই মজুত শুরু হয়েছে। শনিবার গ্যাস না পেয়ে তাঁকে দোকানই বন্ধ রাখতে হয়েছে। বাধ্য হয়ে তাঁরা বেশি দামে গ্যাস কিনছেন।
আরেক দোকানি মো. রাসেল তিন দিন আগে ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনেছেন ২ হাজার ৩০০ টাকায়। তাঁর অভিযোগ, সরকারি সংস্থার নিয়মিত তদারকি না থাকায় সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অন্তত ৫০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, সরকারি দামের কথা শুনিয়ে লাভ নেই; তদারকি থাকলে এভাবে বেশি দামে কিনতে হতো না।
খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, দাম বাড়ার শুরুটা ডিলার পর্যায় থেকেই। সদর উপজেলার কাশীপুর খিলমার্কেটের খুচরা বিক্রেতা হাবিবুর রহমান বলেন, সরকারের ঘোষণার আগেই ডিলাররা ১০০ থেকে ২০০ টাকা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। তা ছাড়া এক কোম্পানির সঙ্গে আরেক কোম্পানির গ্যাসের দামও এক নয়। তাঁরা ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি করছেন ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায়। সরকারি দামের চেয়ে বেশি নিচ্ছেন জেনেও তিনি দাবি করেন, বাধ্য হয়েই এ দামে বিক্রি করছেন।
নগরীর ভূঁইয়াপাড়ার মো. হাসান নিতাইগঞ্জের এক ডিলারের কাছ থেকে সিলিন্ডার কিনে গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করেন। তাঁর ভাষ্য, দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে তিনি পর্যাপ্ত সিলিন্ডার পাচ্ছেন না। ডিলার তাঁকে জানিয়েছেন, ঢাকা থেকেই সরবরাহ আসছে না। মাল না থাকার অজুহাতে ডিলার দাম বাড়িয়েছেন, আর তাঁরাও বাড়িয়ে বিক্রি করছেন।
নগরীর দুটি ডিলারশিপ প্রতিষ্ঠানে গেলেও সেখানকার কর্মীরা কথা বলতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ডিলার বলেন, কোম্পানি সিলিন্ডারের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। এর ওপর পরিবহন খরচ, জায়গার ভাড়া ও আনুষঙ্গিক ব্যয়ও বেড়েছে। এ কারণে কেউ কেউ খুচরা বাজারে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি করছেন।
ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক বিল্লাল হোসেন রবিন জানান, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়ার অভিযোগ তাঁরা পেয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে বিক্রির রসিদও দেওয়া হচ্ছে না। তাঁর ভাষ্য, বাজারে গেলে সিলিন্ডার মেলে না, কিন্তু বেশি দাম দিলে বিক্রেতা ঠিকই বের করে দেন। দোকানদার দোষ দেন ডিলারকে, ডিলার দোষ দেন কোম্পানিকে। তিনি মনে করেন, শুধু দাম নির্ধারণ করে দিলেই হবে না; বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে এবং সংকটের প্রকৃত কারণও খুঁজে বের করতে হবে।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নারায়ণগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক হৃদয় রঞ্জন বনিকের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির জানিয়েছেন, অতিরিক্ত দামে বিক্রি ঠেকাতে বাজার তদারকি শুরু হয়েছে। সোমবার ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে সদর উপজেলার অন্তত তিনটি দোকানকে জরিমানা করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, প্রশাসন এলপিজি বিতরণকারীদের তালিকা সংগ্রহ করছে এবং আমদানি পর্যায় থেকে শুরু করে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত খোঁজখবর নিচ্ছে। বেশি দামে কেনা ও বেশি দামে বিক্রির যে প্রবণতা বাজারে দেখা যাচ্ছে, তা সমাধানে জাতীয় থেকে জেলা পর্যায় পর্যন্ত কাজ চলছে বলে তিনি জানান।
বাজারের এই চিত্র থেকে বোঝা যায়, সংকটের শিকল তৈরি হয়েছে কোম্পানি থেকে ডিলার, ডিলার থেকে খুচরা বিক্রেতা এবং সেখান থেকে ভোক্তা পর্যন্ত। প্রত্যেক ধাপে একজন আরেকজনকে দায়ী করছেন, আর শেষ পর্যন্ত বাড়তি দামের বোঝা বহন করছেন সাধারণ গ্রাহক ও ছোট ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে চায়ের দোকানের মতো যেসব ক্ষুদ্র ব্যবসা সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য সরবরাহ না পাওয়া মানে আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া।
বিশ্লেষকদের মতে, দাম বাড়ার আভাসেই মজুত করার প্রবণতা এ ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরির বড় কারণ হতে পারে। জরিমানার মতো সাময়িক পদক্ষেপে বাজার স্থিতিশীল হবে না। এর জন্য কোম্পানি পর্যায়ে সরবরাহ নিশ্চিত করা, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতার মজুত পরীক্ষা, বিক্রির রসিদ বাধ্যতামূলক করা এবং নিয়মিত অভিযান চালানো জরুরি। একই সঙ্গে সরকার নির্ধারিত দাম ও অভিযোগ জানানোর মাধ্যম সম্পর্কে ভোক্তাদের সচেতন করাও প্রয়োজন, যাতে তাঁরা অতিরিক্ত দাম দাবির প্রতিবাদ করতে পারেন।

