ডেঙ্গুর মৌসুমে রোগীর পথ্য হিসেবে চাহিদা বাড়া মাল্টার আমদানিতে বাংলাদেশে শুল্ক–করের বোঝা এখন আমদানি মূল্যের চেয়েও বেশি। আমদানি পর্যায়ে প্রতি কেজি মাল্টার দাম প্রায় ৮৭ টাকা, অথচ সেই মাল্টার জন্য শুল্ক–কর দিতে হচ্ছে প্রায় ১০৭ টাকা। হিসাব করলে মাল্টা আমদানিতে মোট করভার দাঁড়ায় ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ পণ্যের দামের চেয়ে বেশি অঙ্কের কর সরকারকে দিতে হচ্ছে।
চলতি অর্থবছরের ট্যারিফ অনুযায়ী, টেসলা বা মার্সিডিজ বেঞ্জসহ অন্তত ১৪৬টি এইচএস কোডভুক্ত গাড়ি আমদানিতেও শুল্ক–করের হার মাল্টার চেয়ে কম। একটি সাধারণ ফলের ওপর বিলাসবহুল গাড়ির চেয়েও বেশি করারোপ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে। ফল আমদানিকারকেরা বলছেন, এই কাঠামো যুক্তিসংগত নয়।
বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক তৌহিদুল আলম জানান, বিশ্বের কোথাও ফল আমদানিতে এত বেশি শুল্ক–কর নেই। তাঁর ভাষ্য, বাংলাদেশে মাল্টাসহ তাজা ফলের ওপর করের হার গাড়ির চেয়েও বেশি।
সম্প্রতি আমদানি কমে যাওয়ায় খুচরা বাজারে মাল্টার দাম কেজিপ্রতি ৪৮০ থেকে ৫২০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। পরে সরবরাহ বাড়ায় দাম কিছুটা কমে এখন প্রায় ৪০০ টাকায় নেমেছে। তবে এই দামও আমদানি মূল্যের তুলনায় অনেক বেশি। আমদানি পর্যায়ে কেজিপ্রতি দাম ৮৭ টাকা হলেও খুচরায় তা প্রায় সাড়ে চার গুণ দামে বিক্রি হচ্ছে। এর পেছনে শুল্ক–কর যেমন বড় ভূমিকা রাখছে, তেমনি পরিবহন, সংরক্ষণ ও বিপণন খরচও যুক্ত হচ্ছে। ফলে দাম কমলেও সাধারণ ক্রেতার নাগালে আসেনি।
মাল্টার করভার একদিনে এ জায়গায় পৌঁছায়নি। ২০০৬–০৭ অর্থবছরে মাল্টা আমদানিতে মোট শুল্ক–করভার ছিল ৫৯ দশমিক ২৫ শতাংশ। তখন প্রতি কেজি মাল্টায় কর দিতে হতো প্রায় ১২ টাকা। এরপর ধাপে ধাপে করভার বাড়তে থাকে। ২০২১–২২ অর্থবছর পর্যন্ত তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৯ দশমিক ৩২ শতাংশে। তখন কেজিপ্রতি কর ছিল প্রায় ৩৮ টাকা।
২০২২ সালের মে মাসে করভার আরও এক দফা বাড়ে। তখন ডলার–সংকটের মধ্যে আমদানি নিরুৎসাহিত করতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ফলের ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ করে। এতে মাল্টার মোট শুল্ক–করভার বেড়ে প্রায় ১১৪ শতাংশে ওঠে। বর্তমানে তা আরও বেড়ে ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। হিসাব বলছে, প্রায় দুই দশকে কেজিপ্রতি কর ১২ টাকা থেকে বেড়ে ১০৭ টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ করভার প্রায় নয় গুণ বেড়েছে।
আমদানিকারকদের মতে, ডলার–সংকটের সময় আমদানি কমানোর যে লক্ষ্য নিয়ে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক বসানো হয়েছিল, সেই পরিস্থিতি এখন আর আগের মতো নেই। তাই ওই সময়ের উচ্চ করহার বহাল রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের মতে, এত উচ্চ করভারের প্রভাব সরাসরি পড়ে ভোক্তার পকেটে। ডেঙ্গুর মতো সময়ে রোগীর পরিবারকে বাড়তি দামে ফল কিনতে হয়, যা স্বাস্থ্যঝুঁকির সময় বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করে। তা ছাড়া অতিরিক্ত করের কারণে আমদানি কমলে সরবরাহ সংকট দেখা দেয়, আর তখনই দাম হঠাৎ বেড়ে যায়, যেমনটি সম্প্রতি দেখা গেছে।
এ প্রেক্ষাপটে ফলের মতো ভোগ্যপণ্যের শুল্ক–কাঠামো যৌক্তিক পর্যায়ে আনার দাবি জোরালো হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, কর কমালে একদিকে ভোক্তা কম দামে ফল পাবেন, অন্যদিকে বৈধ আমদানি বাড়লে সরকারের রাজস্ব হারানোর আশঙ্কাও কমতে পারে। তবে এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত বা প্রতিক্রিয়া জানা যায়নি। আসন্ন বাজেট প্রক্রিয়ায় এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ আসে কি না, সেদিকে নজর থাকবে আমদানিকারক ও ভোক্তাদের।

