বাংলাদেশের জ্বালানি পরিকল্পনায় এখন এক কঠিন আর্থিক সমীকরণ সামনে এসেছে। দেশ যখন বর্তমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির ব্যয় সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছে, তখন আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আমদানি সক্ষমতা দ্বিগুণেরও বেশি করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশের জ্বালানির প্রয়োজন কতটা—তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, এই বিপুল ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে বহন করা সম্ভব হবে কি না।
৫ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে দুটি ভাসমান তরলীকৃত গ্যাস টার্মিনাল রয়েছে। এ দুটির সম্মিলিত সরবরাহ সক্ষমতা দৈনিক ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৯ সালের মধ্যে আরও তিনটি টার্মিনাল যুক্ত হলে মোট সক্ষমতা বেড়ে দৈনিক ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছাবে।
সরকারের যুক্তি স্পষ্ট। দেশের নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমছে, শিল্পকারখানায় গ্যাসের সংকট রয়েছে এবং গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অনেকগুলোই পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। এই ঘাটতি সামাল দিতে আমদানিনির্ভর গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হচ্ছে।
কিন্তু অবকাঠামো তৈরি করে বিপুল পরিমাণ গ্যাস আমদানির সক্ষমতা অর্জন করা আর সেই গ্যাস কেনার মতো বৈদেশিক মুদ্রা নিশ্চিত করা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
বিশ্ববাজারের জ্বালানির দাম কতটা অনিশ্চিত হতে পারে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তার বড় উদাহরণ। ইরান যুদ্ধের পর বাংলাদেশকে খোলা বাজার থেকে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ তাপ একক তরলীকৃত গ্যাস প্রায় ২৯ থেকে ৩০ ডলারে কিনতে হয়েছে। ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পরও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে একই ধরনের অস্থিরতা দেখা গিয়েছিল।
এই অভিজ্ঞতা দেখায়, ভবিষ্যতের জ্বালানি মূল্য শুধু চাহিদা ও সরবরাহ দিয়ে নির্ধারিত হয় না। যুদ্ধ, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ হওয়া, নিষেধাজ্ঞা বা বড় উৎপাদক দেশের রাজনৈতিক সংকটও অল্প সময়ের মধ্যে দাম কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
বাংলাদেশ যদি পরিকল্পিত দৈনিক ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট আমদানি সক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার করে এবং প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ তাপ এককের গড় মূল্য ২৮ ডলার হয়, তাহলে বার্ষিক আমদানি ব্যয় প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। দাম ৩০ ডলার হলে ব্যয় প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার হতে পারে।
এই অঙ্ক বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত বড়।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটের আকার ৯ দশমিক ৩৮ ট্রিলিয়ন টাকা। ভবিষ্যতে যুদ্ধ বা আন্তর্জাতিক অস্থিরতার সময় তরলীকৃত গ্যাসের দাম যদি প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ তাপ এককে ২৮ ডলারের আশপাশে থাকে, তাহলে পরিকল্পিত সক্ষমতার সমপরিমাণ গ্যাস আমদানি করতে বছরে বর্তমান বিনিময় হারে ৩ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি প্রয়োজন হতে পারে।
অর্থাৎ শুধু তরলীকৃত গ্যাস আমদানিতেই জাতীয় বাজেটের এক-তৃতীয়াংশের বেশি অর্থ চলে যেতে পারে।
এর সঙ্গে টাকার আরও অবমূল্যায়ন হলে চাপ বাড়বে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের মূল্য ডলারে পরিশোধ করতে হয়। ফলে গ্যাসের আন্তর্জাতিক মূল্য অপরিবর্তিত থাকলেও ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য কমলে দেশীয় মুদ্রায় আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজার নিয়ে কিছু আশাবাদী পূর্বাভাসও রয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত একটি বৈশ্বিক তরলীকৃত গ্যাস বাজারবিষয়ক প্রতিবেদনে ২০২৬ সালে গড় মূল্য প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ তাপ এককে ১০ ডলারের নিচে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ৫ ডলারের নিচে নেমে আসার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল।
কিন্তু জ্বালানি বাজারের বড় দুর্বলতা হলো—এ ধরনের পূর্বাভাস ভবিষ্যতের যুদ্ধ বা সরবরাহ বিপর্যয় আগাম নিশ্চিতভাবে ধরতে পারে না। ওই পূর্বাভাস প্রকাশের পরই ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা শুধু কম দামের আশার ওপর দাঁড় করানো ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সক্ষমতাও এই আলোচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশ বছরে প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই আয় ছিল ৮৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।
যদি শুধু তরলীকৃত গ্যাস আমদানিতেই বছরে ৩০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হয়, তাহলে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় একটি অংশ একটি জ্বালানি পণ্যের পেছনে চলে যাবে।
কিন্তু বাংলাদেশকে শুধু গ্যাস আমদানি করলেই চলে না। খাদ্যশস্য, সার, ভোজ্যতেল, শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, ওষুধ তৈরির উপাদান এবং অন্যান্য জ্বালানি আমদানিতেও বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়।
দেশ বর্তমানে তেল, গ্যাস ও কয়লা আমদানিতে বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ২৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
এই অবস্থায় তরলীকৃত গ্যাস আমদানির জন্য নতুন করে আরও বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা প্রয়োজন হলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় অংশ এখনও তৈরি পোশাক রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল। দুটি খাতই আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাবে ওঠানামা করতে পারে।
অবশ্য পর্যাপ্ত জ্বালানি পাওয়া গেলে শিল্প উৎপাদন বাড়তে পারে, নতুন বিনিয়োগ আসতে পারে এবং রপ্তানিও বাড়তে পারে। কিন্তু এই ইতিবাচক ফল তখনই পাওয়া সম্ভব, যখন আমদানি করা জ্বালানির দাম শিল্পকারখানার পক্ষে সহনীয় থাকবে।
গ্যাসের দাম যদি অত্যধিক বেড়ে যায়, তাহলে শিল্প উৎপাদন বাড়ার পরিবর্তে উল্টো উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে। তখন বাংলাদেশি পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়।
দেশের বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যেই উচ্চ উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে লড়াই করছে। ভর্তুকি কমিয়ে তরলীকৃত গ্যাসের প্রকৃত ব্যয় সরাসরি শিল্পের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলে অনেক কারখানার জন্য তা বহন করা কঠিন হতে পারে।
বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য যদি একই সঙ্গে বহুমুখী এবং উচ্চমূল্যসংযোজনভিত্তিক না হয়, তাহলে শুধু ব্যয়বহুল গ্যাস আমদানির মাধ্যমে শিল্প সম্প্রসারণ করে প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রা আয় হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
জ্বালানির দাম ভবিষ্যতে ২৮ বা ৩০ ডলারে স্থায়ী থাকবে না। কিন্তু দাম কমে গেলেও সমস্যাটি পুরোপুরি শেষ হবে না।
প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ তাপ এককের দাম যদি ১০ ডলারে নেমে আসে, তবুও দৈনিক ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট সমপরিমাণ তরলীকৃত গ্যাস আমদানিতে বছরে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি প্রয়োজন হবে।
বাংলাদেশের মতো সীমিত রপ্তানি ভিত্তির অর্থনীতির জন্য এই ব্যয়ও সামান্য নয়। কারণ একই বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধ, খাদ্য ও কাঁচামাল আমদানি এবং উন্নয়ন প্রকল্পের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও কিনতে হয়।
তবে শুধু গ্যাস কেনার খরচই নয়, টার্মিনালের অবকাঠামোও বড় আর্থিক দায় তৈরি করতে পারে।
একেকটি তরলীকৃত গ্যাস টার্মিনাল নির্মাণে সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে প্রায় ৫ হাজার কোটি থেকে ১১ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে।
বাংলাদেশের প্রথম তরলীকৃত গ্যাস টার্মিনাল ২০১৬-১৭ সালে নির্মাণ করা হয়। তখন এর ব্যয় ছিল প্রায় ১৮ কোটি ডলার, যা সেই সময়ের হিসাবে প্রায় ২ হাজার ২১৪ কোটি টাকা।
কিন্তু নির্মাণ ব্যয়ের বাইরেও রয়েছে নিয়মিত সক্ষমতা ভাড়া।
এই টার্মিনালের জন্য পেট্রোবাংলাকে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ৯০ লাখ টাকা সক্ষমতা ভাড়া দিতে হয়। বছরে এই ব্যয় প্রায় ১ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। ১৫ বছরের চুক্তিতে মোট সক্ষমতা ভাড়া প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
এই টার্মিনালের ব্যয়কে ভিত্তি হিসেবে ধরলে নতুন তিনটি টার্মিনালের প্রতিটির গড় ব্যয় অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। এগুলোর সক্ষমতা ভাড়া মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে পাঁচটি টার্মিনালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোট ব্যয় প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
প্রস্তাবিত তৃতীয় টার্মিনাল নিয়েও আরেকটি ব্যয়ের প্রশ্ন সামনে এসেছে। একটি চীনা প্রতিষ্ঠানের জন্য দৈনিক ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলার ভাড়ার প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এটি প্রতিদিন প্রায় ৪ কোটি ২০ লাখ টাকা।
বর্তমান টার্মিনালগুলোর তুলনায় এই হার প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। প্রস্তাবিত হার অপরিবর্তিত থাকলে ভবিষ্যতে সরকারের সক্ষমতা ভাড়ার দায় আরও বাড়বে।
এখানেই আসে আরেকটি বড় ঝুঁকি—অব্যবহৃত অবকাঠামো।
বাংলাদেশ যদি বিপুল অর্থ ব্যয় করে তিনটি নতুন টার্মিনাল নির্মাণ করে, কিন্তু পরে গ্যাসের আন্তর্জাতিক মূল্য, ডলার সংকট বা অন্য কোনো কারণে প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস আমদানি করতে না পারে, তখন টার্মিনালগুলোর সক্ষমতার বড় অংশ অব্যবহৃত থাকতে পারে।
কিন্তু টার্মিনাল ব্যবহার না হলেও ভাড়া, ঋণ ও সুদের দায় বন্ধ হবে না।
বিদ্যুৎ খাতের অভিজ্ঞতা এই ঝুঁকির একটি বড় উদাহরণ। দেশে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র কম ব্যবহৃত বা নিষ্ক্রিয় থাকলেও বছরে গড়ে ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি সক্ষমতা ভাড়া দিতে হচ্ছে। শুধু ২০২৫ সালেই এই ব্যয় ৪২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
একই ধরনের কাঠামো যদি তরলীকৃত গ্যাস খাতেও তৈরি হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় বহন করতে হতে পারে।
২০২৬ সালের শুরুর দিকে বাংলাদেশের সরকারি ঋণ ২২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। প্রতিবছর ঋণ প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা করে বাড়ছে। একই সঙ্গে সুদ পরিশোধের চাপও বাড়ছে।
এই অবস্থায় বিপুল জ্বালানি আমদানি এবং ঋণনির্ভর অবকাঠামো বিনিয়োগ একসঙ্গে বাড়লে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে সামগ্রিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশ একই সময়ে বিকল্প জ্বালানি উৎসেও বিনিয়োগ করছে।
সরকার ১৫০টি কূপের মাধ্যমে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান সফল হলে কিংবা সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন দ্রুত বাড়লে ভবিষ্যতে আমদানিকৃত তরলীকৃত গ্যাসের চাহিদা ধারণার তুলনায় কমও হতে পারে।
সে ক্ষেত্রে বিপুল বিনিয়োগে নির্মিত টার্মিনালগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহার না হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
জুরিখভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের ২০২৬-২০৩৫ মেয়াদের বৈশ্বিক তরলীকৃত গ্যাস বাজারবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনের মতো কয়েকটি দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তরলীকৃত গ্যাসভিত্তিক কিছু প্রকল্প বাতিল করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তরলীকৃত গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় প্রতি মেগাওয়াট ঘণ্টায় প্রায় ৮০ থেকে ১২০ ডলার হতে পারে। বিপরীতে সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা মিলিয়ে এই ব্যয় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ ডলার।
এই তুলনা বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা করার সময় শুধু আজকের সংকট নয়, আগামী এক বা দুই দশকে প্রযুক্তি ও জ্বালানির দামের পরিবর্তনও বিবেচনায় নিতে হবে।
নতুন টার্মিনাল অনুমোদনের আগে তাই বিভিন্ন মূল্য পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক হিসাব প্রকাশ করা জরুরি।
প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ তাপ এককের দাম ১০, ২০ এবং ৩০ ডলার হলে বাংলাদেশের বছরে কত বৈদেশিক মুদ্রা প্রয়োজন হবে, অর্থ কোথা থেকে আসবে, সক্ষমতা ভাড়া কত হবে এবং টার্মিনাল পুরোপুরি ব্যবহার না হলেও কত অর্থ দিতে হবে—এসব হিসাব জনসমক্ষে থাকা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে তরলীকৃত গ্যাসে বিনিয়োগের বিকল্প ব্যয়ও তুলনা করা দরকার।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, পুরোনো গ্যাসকূপের পুনর্বাসন, সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নয়ন, শিল্পে জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ এবং জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার আধুনিকায়নে একই অর্থ বিনিয়োগ করলে কী ধরনের সুবিধা পাওয়া যেতে পারে—সে বিশ্লেষণও প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জ্বালানি পরিকল্পনা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়।
২০২৩ সালে আগের সরকার জাপানের সহায়তায় সমন্বিত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছিল। ওই পরিকল্পনায় ২০৪০ সালের মধ্যে দৈনিক সর্বোচ্চ ৫ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট তরলীকৃত গ্যাস আমদানির সুযোগ এবং জ্বালানি অবকাঠামোয় ১৭৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা ছিল।
কিছু বিশেষজ্ঞ সে সময় জাপানের বাণিজ্যিক স্বার্থ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন। কারণ দেশটি আন্তর্জাতিক তরলীকৃত গ্যাস বাণিজ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত।
পরবর্তীতে সরকার পরিবর্তনের পর ওই মহাপরিকল্পনার রাজনৈতিক গুরুত্ব কমে গেলেও বাংলাদেশের মৌলিক জ্বালানি কৌশল কতটা বদলেছে, সে প্রশ্ন এখনও রয়ে গেছে। বর্তমান প্রশাসনও আগের পরিকল্পনার সঙ্গে মিল রয়েছে—এমন কয়েকটি উদ্যোগ এগিয়ে নিচ্ছে।
বাস্তবতা হলো, স্বল্পমেয়াদে বাংলাদেশের তরলীকৃত গ্যাস প্রয়োজন রয়েছে। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে, শিল্পে সংকট রয়েছে এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ছাড়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন।
কিন্তু তরলীকৃত গ্যাসকে স্থায়ী ও প্রধান সমাধান হিসেবে বিবেচনা করলে বৈদেশিক মুদ্রা, ভর্তুকি, ঋণ ও দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা ভাড়ার বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বর্তমান দৈনিক ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট আমদানিই যখন অর্থনৈতিক ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি করছে, তখন মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট সক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করা হবে—সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
আর তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, প্রয়োজনের সময় বাংলাদেশ গ্যাস কিনতে পারবে কি না।
জ্বালানি নিরাপত্তা মানে শুধু টার্মিনাল নির্মাণ করা নয়। জ্বালানি কেনার অর্থ থাকা, মূল্য সহনীয় রাখা, শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখা এবং ভবিষ্যতের আর্থিক দায় নিয়ন্ত্রণে রাখাও একইভাবে জরুরি।
তাই তরলীকৃত গ্যাস সম্প্রসারণের সিদ্ধান্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা। আজকের গ্যাস সংকট সমাধান করতে গিয়ে আগামী দিনের বৈদেশিক মুদ্রা ও ঋণের সংকট তৈরি হলে সেটি টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা হবে না।

