খাদ্য ও জ্বালানি পণ্যের দর অস্বাভাবিক বৃদ্ধি বা হঠাৎ লাফ দেওয়া এখন বিশ্ব অর্থনীতিতে নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হতে যাচ্ছে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। আন্তর্জাতিক এই ঋণদাতা সংস্থাটির মতে, জীবনযাত্রার ব্যয়ের এই আকস্মিক সংকট কেবল তাৎক্ষণিক কষ্টই বাড়ায় না, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশাকে উঁচু জায়গায় বেঁধে ফেলে, চরম দারিদ্র্য বৃদ্ধি করে এবং সার্বিক অর্থনৈতিক স্থায়িত্বকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলে দেয়।
সংস্থাটির আসন্ন ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’-এর দ্বিতীয় অধ্যায়ে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিগত তিন দশকের সরকারি কৌশল এবং দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে তৈরি একটি নতুন অর্থনৈতিক মডেল বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, সাধারণ বা প্রচলিত মূল্যস্ফীতির পরিমাপের চেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর অনুভূত মূল্যস্ফীতি ০.৮ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি। কারণ নিম্নআয়ের মানুষ তাদের বাজেটের সিংহভাগই ব্যয় করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে। এই নতুন হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আগের ধারণার চেয়ে অতিরিক্ত ২ কোটি ৩০ লাখ (২৩ মিলিয়ন) মানুষ চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে।
২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া সংঘাতের কারণে নিত্যপণ্যের দামে যে তীব্র উর্ধ্বগতি দেখা যায়, তা বিশ্বজুড়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আইএমএফের মতে, বিশ্ব অর্থনীতি সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের ধাক্কা কিছুটা সামলে উঠলেও ২০২৬ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩ শতাংশে আটকে থাকতে পারে, যা ২০২৪ ও ২০২৫ সালের গড় ৩.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় বেশ কম।
আইএমএফের অর্থনীতিবিদ চিয়ারা মাগির সহ-নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় উঠে এসেছে যে, জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটের সময় স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা অনেকটাই বেড়ে যায়। এমনকি সংকট শুরুর তিন বছর পরও এই প্রত্যাশা প্রাক-সংকট পর্যায়ের চেয়ে বেশ উপরে অবস্থান করে। দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির এই উঁচু অবস্থান কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে বাধ্য করে নীতি সুদহার বাড়িয়ে রাখতে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে ধীরগতির করে তোলে।
সংকট মোকাবিলায় সরকারগুলোর অনুসৃত নীতি নিয়ে একটি কঠোর বাস্তবতা তুলে ধরেছে আইএমএফ। সংস্থাটি জানায়, দর নিয়ন্ত্রণ বা সংবেদনশীল পণ্যে কর কমানোর মতো সর্বজনীন পদক্ষেপগুলো সরকারের বাজেটে নির্দিষ্ট নগদ সহায়তার চেয়ে তিন থেকে ছয় গুণ বেশি ব্যয়বহুল। আর উৎপাদক পর্যায়ে ঢালাও ভর্তুকি দেওয়া হলে তার খরচ দাঁড়ায় প্রায় ২২ গুণ বেশি।
স্টিফেনের মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে উৎপাদক ভর্তুকির সুযোগ নিয়ে অনেক সময় পণ্য কম খরচে বিদেশে রপ্তানি হয়ে যায়। এতে দেশীয় করদাতাদের টাকায় মূলত বিদেশের ভোক্তারা উপকৃত হন। তাই সামাজিক সুরক্ষা শক্তিশালী করতে দরিদ্র ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সরাসরি সুনির্দিষ্ট নগদ সহায়তা (টার্গেটেড ট্রান্সফার) দেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
জর্জেটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ শান্তায়নন দেবরাজন উল্লেখ করেছেন, জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য, ঋণের চড়া চাপ এবং আবহাওয়ার অস্বাভাবিক পরিবর্তনের (যেমন সুপার এল নিনো) কারণে নিম্নআয়ের দেশগুলো চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ইন্দোনেশিয়া বা মিসরের মতো দেশগুলো ইতোমধ্যেই ঢালাও ভর্তুকি থেকে সরে এসে নির্দিষ্ট নগদ সহায়তার দিকে ঝুঁকছে। তিনি স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, সংকট আসার আগেই নিজের ঘর মেরামত করে নেওয়া উচিত, কারণ সংকট ঘনীভূত হলে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিরোধের কারণে সংস্কার বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

