বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ২০ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও নতুন কাজ তৈরি হচ্ছে মাত্র ৯ লাখের মতো। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ প্রতিবেদনের একটি বিশেষ অধ্যায়ে এ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের মূল্যায়ন, দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সেই গতিতে বাড়েনি।
২০১৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ের হিসাবে নতুন কাজের প্রতি ১০টির প্রায় ৭টিই তৈরি হয়েছে কৃষিতে। শিল্প খাতে উল্টো কর্মসংস্থান কমেছে। অথচ ২০১৫-১৬ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি গড়ে ছিল ৬ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থনীতি বড় হয়েছে, কিন্তু সেই সুফল পর্যাপ্ত চাকরিতে রূপ নেয়নি।
নারীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও কঠিন। এ সময়ে নারীদের জন্য কৃষিতে ৪২ লাখ নতুন কাজ তৈরি হলেও শিল্পে ১১ লাখ এবং সেবা খাতে ৮ লাখ কাজ কমেছে। নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ ২০২২ সালের ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে ২০২৪ সালে ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশে নেমেছে।
প্রতিবেদনটি একক জরিপের ভিত্তিতে তৈরি নয়। আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের তথ্য নেওয়া হয়েছে ২০২২ সালের ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এন্টারপ্রাইজ সার্ভে থেকে। এর সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে বিজনেস রেডি ২০২৫, বিজনেস অব দ্য স্টেট ২০১৯, বাংলাদেশ কান্ট্রি প্রাইভেট সেক্টর ডায়াগনস্টিক ২০২৫ এবং জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার বিনিয়োগ-তথ্য।
বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থাকে ‘উৎপাদনশীলতার বৈপরীত্য’ বলেছে। দেশের উৎপাদন ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীপ্রতি আয় দক্ষিণ এশিয়ার তুলনামূলক মানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। সবচেয়ে বেশি মানুষ কাজ করেন সেবা খাতে, যেখানে ২০১৬ সালের পর শ্রম উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধি স্থবির।
নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরির গতিও কম। আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাত্র ৮ শতাংশ গত পাঁচ বছরে চালু হয়েছে। চীনে এ হার ৩২ শতাংশ। বাংলাদেশের ২১ শতাংশ আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান ২০১২ সালের পর কার্যক্রম শুরু করেছে, যেখানে ভিয়েতনামে এ হার ৪০ শতাংশ। ২০১৩ সালের পর বিনিয়োগও কমেছে, বিশেষ করে ছোট প্রতিষ্ঠানে। প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ জিডিপির ১ শতাংশের নিচে, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন হারগুলোর একটি। এই বিনিয়োগের বড় অংশ গেছে ইউটিলিটি খাতে, উৎপাদন ও বাজারমুখী সেবায় নয়। ফলে স্থানীয় সরবরাহকারীরা প্রযুক্তি ও দক্ষতার সুবিধা কম পেয়েছে।
প্রবৃদ্ধির সুফল কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। উৎপাদনশীলতায় শীর্ষ ১০ শতাংশ আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানকে প্রতিবেদনে ‘ফ্রন্টিয়ার প্রতিষ্ঠান’ বলা হয়েছে। এগুলো অন্য আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ে গড়ে ১১ গুণ বেশি উৎপাদনশীল। ২০২২ সালে আনুষ্ঠানিক খাতের মোট বিক্রয় আয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ এসেছে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে। ২০১৩ সালে এ অংশ ছিল ৪১ শতাংশ। অথচ আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে তাদের অংশ মাত্র ১৫ শতাংশ।
রপ্তানিতেও একই কেন্দ্রীভবন দেখা যাচ্ছে। ১০ বছর আগে মোট রপ্তানি আয়ে ফ্রন্টিয়ার প্রতিষ্ঠানের অংশ ছিল ৩৭ শতাংশ, ২০২২ সালে তা ৬৯ শতাংশ। একই সময়ে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের হার ২৫ শতাংশ থেকে কমে ১৩ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ রপ্তানি আয় এখন আরও কম প্রতিষ্ঠানের হাতে। তৈরি পোশাক খাতেও এই বৈপরীত্য আছে। এ খাতের ফ্রন্টিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো খাতটির মোট বিক্রয় আয়ের প্রায় অর্ধেক তৈরি করে, কিন্তু আনুষ্ঠানিক বেসরকারি খাতের প্রতি ১২টি চাকরির মাত্র একটি এসব প্রতিষ্ঠানে। বেশির ভাগ কর্মসংস্থান হয়েছে নন-ফ্রন্টিয়ার প্রতিষ্ঠানে, অর্থাৎ দেশের বাজারনির্ভর সেবা এবং নতুন ও ছোট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু এদের বিনিয়োগ, প্রযুক্তি গ্রহণ ও রপ্তানি বাজারে ঢোকার সুযোগ তুলনামূলক কম। বিশ্বব্যাংকের বক্তব্য, শুধু বড় ও রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের প্রবৃদ্ধি দিয়ে প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থান হবে না। ক্ষুদ্র, মাঝারি ও সম্ভাবনাময় অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানকেও বড় হওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় হওয়ার পথে প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে জটিল সরকারি প্রক্রিয়া, অর্থায়নের অভাব, অসম প্রতিযোগিতা ও বিদ্যুৎ-সংকট। প্রতিবেদনের হিসাবে, প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপকদের গড়ে ১৩ শতাংশ সময় সরকারি নিয়মকানুন মানতে ও বিভিন্ন দপ্তরের চাহিদা মেটাতে চলে যায়, যা আঞ্চলিক তুলনায় সর্বোচ্চ। চট্টগ্রামে এ সময় প্রায় ৪০ শতাংশ এবং বরিশালে ৬০ শতাংশ। নন-ফ্রন্টিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে কাজ করতে ফ্রন্টিয়ার প্রতিষ্ঠানের চেয়ে প্রায় ৫ শতাংশ পয়েন্ট বেশি সময় দিতে হয়, কর পরিদর্শনের মুখেও পড়তে হয় বেশি। প্রতিবেদনের মতে, শুধু নিয়ম মানার পার্থক্য দিয়ে এ ব্যবধান ব্যাখ্যা হয় না, এতে প্রতিষ্ঠানভেদে ভিন্ন আচরণেরও প্রতিফলন আছে।
অনুমোদনের সময়ও দীর্ঘ। একটি পরিচালন লাইসেন্স পেতে গড়ে ২৮ দিন লাগে। নির্মাণসংক্রান্ত অনুমতি ও আমদানি লাইসেন্সে গড়ে লাগে ৪৯ দিন করে। চীন বা ভারতে একই ধরনের অনুমোদনে যে সময় লাগে, বাংলাদেশে তার প্রায় দ্বিগুণ। একটি আনুষ্ঠানিক ব্যবসা শুরু করতে আনুমানিক ১০ হাজার ডলার ব্যয় হয়। ছয় বছরের কম বয়সী অর্ধেকের বেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য এ ব্যয় বার্ষিক বিক্রয় আয়ের ১০ শতাংশের বেশি। নিয়ম সামলাতে বেশি সময় দেওয়া প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী সম্পদে বিনিয়োগের সম্ভাবনা ১৯ শতাংশ কম।
বিশ্বব্যাংকের বিজনেস রেডি মূল্যায়নে তিনটি বিষয়ে বাংলাদেশের স্কোর নিচু: বাজারে প্রতিযোগিতা, বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তি এবং দেউলিয়াত্ব ব্যবস্থাপনা। প্রতিযোগিতার নিয়ম ঠিকমতো প্রয়োগ না হওয়ায় কম উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠান সহজে টিকে থাকে, আর নতুন ও বেশি উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানের বাজারে ঢোকা ও বড় হওয়া বাধাগ্রস্ত হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৬০ শতাংশ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ব্যবসা করে, কিন্তু নিয়ন্ত্রিত দাম, সুরক্ষামূলক শুল্ক ও বিশেষ সুবিধার কারণে উৎপাদনশীলতা কম হলেও তারা বাড়তি সুবিধা পায়। বাণিজ্যিক আদালতের প্রক্রিয়া ধীর ও অনিশ্চিত। সমস্যায় পড়া প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন বা সুশৃঙ্খলভাবে বাজার থেকে বের করার ব্যবস্থাও দুর্বল। ফলে কম উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠান থেকে বেশি উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানে মূলধন যেতে পারে না।
কর ও সরকারি সুবিধার বণ্টনে বড় বৈষম্যের কথাও বলা হয়েছে। সাধারণ করপোরেট আয়করের হার ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ, অথচ তৈরি পোশাক ও বস্ত্র উৎপাদনকারীরা ১২ থেকে ১৫ শতাংশ হারে কর দেওয়ার সুবিধা পায়। প্রতিবেদনের হিসাবে, করপোরেট করছাড়ের কারণে শুধু ২০২১ সালেই সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছিল জিডিপির প্রায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৮ শতাংশ হওয়ায় এ ক্ষতিকে উল্লেখযোগ্য বলা হয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের আকার ২০২০-২১ অর্থবছরে ৯ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। এ তহবিল থেকে রপ্তানিকারকেরা সর্বনিম্ন ২ শতাংশ সুদে ঋণ পেয়েছেন, অন্য উৎপাদনকারীদের ক্ষেত্রে সুদের হার ছিল সর্বোচ্চ ১৩ শতাংশ। ব্যাংকঋণ বা ঋণসীমা আছে ফ্রন্টিয়ার প্রতিষ্ঠানের ৪২ শতাংশের, নন-ফ্রন্টিয়ারের ক্ষেত্রে ২৯ শতাংশের।
বাণিজ্যনীতিতেও তৈরি পোশাকের প্রাধান্য স্পষ্ট। বন্ডেড ওয়্যারহাউসের মাধ্যমে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুবিধার ৯০ শতাংশের বেশি তৈরি পোশাক ও সংশ্লিষ্ট খাতে কেন্দ্রীভূত। দেশের বাজারে পণ্য বিক্রি করা প্রতিষ্ঠানগুলো চূড়ান্ত পণ্য আমদানিতে গড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ শুল্কের মুখে পড়ে, যা দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের প্রায় দ্বিগুণ। এ ধরনের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার চেয়ে দেশের বাজারের জন্য উৎপাদন বেশি লাভজনক হতে পারে, ফলে রপ্তানিতে যাওয়ার আগ্রহ কমে। বিশ্বব্যাংক একে কাঠামোগত ‘রপ্তানিবিরোধী পক্ষপাত’ বলেছে। এর মধ্যে ২০২৬ সালের জুনে আরও ১০টি রপ্তানি খাতকে ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে এবং স্বর্ণালংকার রপ্তানির জন্য আলাদা বন্ড বিধিমালা হয়েছে।
অর্থায়নের সংকটও প্রতিষ্ঠানের বড় হওয়ার পথে বাধা। প্রায় ২২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান আংশিকভাবে এবং আরও ৮ শতাংশ পুরোপুরি ঋণসুবিধা থেকে বঞ্চিত। ব্যাংকঋণ আছে এমন প্রতিষ্ঠানের শ্রম উৎপাদনশীলতা অন্যদের চেয়ে প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। কিন্তু নতুন ও ছোট প্রতিষ্ঠানের পর্যাপ্ত জামানত থাকে না, ঋণযোগ্যতা যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থাও দুর্বল। ফলে সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় মূলধন পায় না।
বিনিয়োগসেবার ক্ষেত্রে দায়িত্ব একাধিক সংস্থায় ছড়ানো। এর মধ্যে আছে বিডা, বেজা, হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সংস্থা। দায়িত্বে মিল থাকলেও কার্যকর সমন্বয় নেই। বিনিয়োগকারীর নিবন্ধন, প্রণোদনা, জমি, লাইসেন্স ও বিনিয়োগ-পরবর্তী সহায়তার সামগ্রিক ফলাফলের দায় কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের নয়। ফলে একই ধরনের একাধিক অনুমোদন নিতে হয়। রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের বড় রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে পোশাক কারখানা, তুলনামূলক সহজ প্রক্রিয়ার সুবিধা পায়। সাধারণ প্রতিষ্ঠানকে যেতে হয় আরও খণ্ডিত ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে। ২০২৬ সালের আগস্টে বিডা, বেজা ও পিপিপি কর্তৃপক্ষ একীভূত করে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ গঠন করা হয়েছে। তবে হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ, বেপজা ও বিসিকসহ কয়েকটি সংস্থা এখনো আলাদা। ফলে একক নেতৃত্ব তৈরি হলেও সব সেবা এক ছাদের নিচে আসেনি, ওয়ান-স্টপ সেবাও বাস্তবে মিলছে না।
বিদ্যুৎ সরবরাহকে ব্যবসার সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করা বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক। প্রায় ৭১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের মুখে পড়ে এবং একটি প্রতিষ্ঠানকে মাসে গড়ে ২৬ বার এ সমস্যা সামলাতে হয়। এতে বার্ষিক বিক্রির গড়ে প্রায় ৯ শতাংশ ক্ষতি হয়। বিদ্যুৎ-সংযোগ পেতে গড়ে ৮৯ দিন লাগে। প্রায় এক-চতুর্থাংশ প্রতিষ্ঠানকে মাঝেমধ্যে গ্রিডের বদলে নিজস্ব জেনারেটর চালাতে হয়, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়ায়। অর্থনৈতিক কেন্দ্রের বাইরে সরবরাহ আরও অনির্ভরযোগ্য, ফলে অঞ্চলভেদে ব্যবসার সুযোগে বৈষম্য বাড়ে। প্রতিবেদনের পূর্বাভাস, ২০৩০ সাল পর্যন্ত বিদ্যুতের চাহিদা বছরে প্রায় ৭ শতাংশ হারে বাড়তে পারে।
অনানুষ্ঠানিক খাত নিয়েও প্রতিবেদনে ভিন্ন একটি চিত্র আছে। সব অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান কম উৎপাদনশীল নয়। প্রায় ৪০ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান ছোট আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের সমান উৎপাদনশীলতায় কাজ করছে। উচ্চ উৎপাদনশীল এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় অর্ধেকের বয়স ১৫ বছরের কম, প্রায় ৮০ শতাংশ খুচরা ব্যবসা ও সেবা খাতে এবং প্রায় ৮৫ শতাংশ ঢাকা মহানগর এলাকায়। আনুষ্ঠানিক বাজার, ব্যাংকঋণ, সরবরাহকারী উন্নয়ন কর্মসূচি বা সরকারি সহায়তা না পেয়েও বড় বাজার ও পরিবহন নেটওয়ার্কের কাছাকাছি থাকায় তারা তুলনামূলক ভালো করছে।
নিবন্ধন না করার পেছনের কারণও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রায় ৭৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠান নিবন্ধনের ব্যয় ও সময়কে বাধা বলেছে। আনুষ্ঠানিক হলে সম্ভাব্য করের বোঝাকে বাধা বলেছে ৭১ শতাংশ, সরকারি কর্মকর্তাদের পরিদর্শন বা যোগাযোগকে ৬১ শতাংশ এবং প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবকে ৩৫ শতাংশ। আবার নিবন্ধিত হলে ঋণ ও অর্থায়নের সুযোগ বাড়বে বলে মনে করে ৫০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান, নতুন গ্রাহক পাওয়া যাবে বলে মনে করে ৪৯ শতাংশ। সমস্যা হলো, এসব সুবিধা তাৎক্ষণিক বা নিশ্চিত নয়, অথচ নিবন্ধন, কর ও পরিদর্শনের ব্যয় শুরু থেকেই বহন করতে হয়। তাই অনেক প্রতিষ্ঠানের কাছে অনানুষ্ঠানিক থাকা একটি হিসাব-কষা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত।
সংস্কার নিয়ে বিশ্বব্যাংকের মূল পরামর্শ ‘স্মার্ট ডিরেগুলেশন’ বা বুদ্ধিদীপ্তভাবে নিয়ন্ত্রণ সহজ করা। এর অর্থ সব নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া নয়। কম ঝুঁকির ব্যবসায় অনুমোদন ও নিয়ম মানার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে, আর বেশি ঝুঁকির কার্যক্রমে তদারকি শক্তিশালী করতে হবে। স্বল্প মেয়াদে সারা দেশে ওয়ান-স্টপ সেবা সম্প্রসারণ এবং লাইসেন্স দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়া শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ডিজিটাল করার কথা বলা হয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন, পরিদর্শন ও নিয়ম মানার প্রক্রিয়া সহজ করা, করছাড়ের মতো প্রণোদনা দিয়ে তাদের আনুষ্ঠানিক হতে উৎসাহিত করা এবং ঋণদাতার ঝুঁকি কমিয়ে অর্থায়ন নিশ্চিত করার পরামর্শও আছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রতিযোগিতার সমান পরিবেশ তৈরির কথাও বলা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সহায়তার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি। জাতীয় শুল্কনীতি বাস্তবায়ন করে শুল্ক ও শুল্কের মতো অন্যান্য বাধা ধাপে ধাপে কমানো এবং সীমান্ত বাণিজ্য ডিজিটাল ও কাগজবিহীন করার কথা বলা হয়েছে। করছাড়, কম সুদের ঋণসহ রাষ্ট্রের সব সুবিধার একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার তৈরি, সুবিধা পাওয়ার বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ড, স্বচ্ছ নির্বাচনপ্রক্রিয়া এবং সুবিধা দেওয়ার আগে ও পরে প্রভাব মূল্যায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিটি সহায়তার নির্দিষ্ট মেয়াদ রাখার পরামর্শও আছে, যাতে রাষ্ট্রীয় সুবিধা স্থায়ী অধিকারে পরিণত না হয়ে উৎপাদনশীলতা ও বহুমুখীকরণের ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত থাকে।
মধ্য মেয়াদে ব্যবসার ঝুঁকি অনুযায়ী আলাদা লাইসেন্স ও পরিদর্শনব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে, যেখানে কম ঝুঁকির কার্যক্রম কিছু অনুমোদন থেকে অব্যাহতি পেতে পারে। বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে ডিজিটাল মামলা ব্যবস্থাপনা, সংশ্লিষ্টদের বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং সারা দেশে বাণিজ্যিক আদালত সম্প্রসারণের কথাও আছে। দীর্ঘ মেয়াদে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি, ঝুঁকিভিত্তিক পরিদর্শন ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ছোট প্রতিষ্ঠানকে বড় দেশীয় ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার কথাও বলা হয়েছে, যাতে তারা প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা জ্ঞান ও নতুন বাজারের সুযোগ পায়।
প্রতিবেদনের মূল বক্তব্য, সুরক্ষা ও বিবেচনানির্ভর সুবিধার বদলে প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও উৎপাদনশীলতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাহলেই বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি আরও বেশি ও ভালো মানের কর্মসংস্থানে রূপ নিতে পারবে।
এই চিত্র থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট, প্রতিবছর শ্রমবাজারে ঢোকা ২০ লাখের মধ্যে ১১ লাখের জন্য নতুন কাজ তৈরি হচ্ছে না। এই ঘাটতি পূরণ না হলে বেকারত্ব, অনানুষ্ঠানিক কাজ ও বিদেশমুখী শ্রমস্রোতের চাপ বাড়তে পারে। তবে প্রতিবেদনের অনেক তথ্য ২০২২ সালের জরিপের ওপর নির্ভরশীল। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে চিত্র কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। জুনে নতুন খাতকে বন্ড সুবিধা এবং আগস্টে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ গঠনের মতো সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত সেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, যদিও এর প্রভাব এখনো পরিমাপযোগ্য নয়।
এখন নজর থাকবে সরকার বিশ্বব্যাংকের এই সুপারিশগুলোর কতটা গ্রহণ করে, সেদিকে। বিশেষ করে নিয়ন্ত্রণ সহজ করা, বিদ্যুৎ সরবরাহ নির্ভরযোগ্য করা এবং ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন বাড়ানোর পদক্ষেপ কত দ্রুত আসে, তার ওপরই নির্ভর করবে প্রবৃদ্ধি আসলে কত মানুষের কাজে রূপ নেয়।

