বাংলাদেশ রেলওয়ের দীর্ঘদিনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে পুরোনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ লোকোমোটিভ। বয়সের কারণে অনেক ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা কমে গেছে, বেড়েছে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং যেকোনো সময় ট্রেন পরিচালনায় বড় ধরনের সমস্যার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এই সংকট কাটাতে এবার বড় ধরনের আধুনিকায়ন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ৩০টি নতুন মিটারগেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ কেনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যার সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা।
প্রকল্পটি বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। অনুমোদন পেলে ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন লোকোমোটিভগুলো যুক্ত হলে পুরোনো ইঞ্জিনের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং দেশের রেল পরিবহন ব্যবস্থায় গতি, নির্ভরযোগ্যতা ও সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের বহরে মোট ২৯২টি লোকোমোটিভ রয়েছে। এর মধ্যে ১৬৪টি মিটারগেজ এবং ১২৮টি ব্রডগেজ ইঞ্জিন। তবে মিটারগেজ ইঞ্জিনগুলোর বড় অংশই এখন পুরোনো হয়ে গেছে। রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৬৪টি মিটারগেজ লোকোমোটিভের মধ্যে ১১৫টি তাদের নির্ধারিত অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল অতিক্রম করেছে। এর মধ্যে ৬২টি ইঞ্জিনের বয়স ৪০ বছরের বেশি হলেও এখনো নিয়মিত ট্রেন পরিচালনায় ব্যবহার করা হচ্ছে।
সাধারণত একটি ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ প্রায় ৩০ বছর পর্যন্ত কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু বাংলাদেশে ৭৯টি মিটারগেজ ইঞ্জিন এই সময়সীমা পার হওয়ার পরও সচল রাখা হয়েছে। এসব পুরোনো ইঞ্জিন রক্ষণাবেক্ষণ করতে বেশি খরচ হয় এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে নতুন ইঞ্জিন যুক্ত করা জরুরি হয়ে উঠেছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পে সরকার ও এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (AIIB) যৌথভাবে অর্থায়ন করবে। এর মধ্যে সরকারের অংশ থাকবে ৮১১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা, আর AIIB দেবে ১ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা। প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি লোকোমোটিভ কেনার গড় ব্যয় হবে প্রায় ৬৯ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ইঞ্জিনগুলো কেনা হবে, তবে এখনো কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা কোম্পানিকে নির্বাচন করা হয়নি।
নতুন লোকোমোটিভ কেনার পাশাপাশি প্রকল্পের আওতায় প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ সরঞ্জাম এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। রেল প্রকৌশলী ও কর্মীদের আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নিতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞরা স্থানীয়ভাবে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেবেন, যাতে ভবিষ্যতে নতুন ইঞ্জিনগুলো কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যায়।
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় রেলের গুরুত্ব বাড়লেও দীর্ঘদিন ধরে সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের মতো গুরুত্বপূর্ণ করিডোরে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু পর্যাপ্ত সংখ্যক কার্যকর লোকোমোটিভ না থাকায় রেলওয়ে এই চাহিদা পুরোপুরি পূরণ করতে পারছে না।
নতুন ইঞ্জিন যুক্ত হলে আন্তঃনগর ট্রেন পরিচালনা আরও নির্ভরযোগ্য হবে এবং মালবাহী ট্রেনের সক্ষমতাও বাড়বে। এতে পণ্য পরিবহনের সময় কমবে, শিল্প খাতের সরবরাহ ব্যবস্থা আরও কার্যকর হবে এবং সড়কপথের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমার কারণে রেলওয়ের আর্থিক কার্যক্রমেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে বাংলাদেশের রেল ব্যবস্থায় মিটারগেজ থেকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর একটি বড় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। রেলওয়ের মাস্টার প্ল্যানে ২০৪০ সালের মধ্যে এই পরিবর্তনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিতে মিটারগেজ অপারেশন আরও দীর্ঘ সময় চালিয়ে যেতে হতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫৫ থেকে ২০৬০ সাল পর্যন্ত কিছু মিটারগেজ রেল কার্যক্রম চালু থাকতে পারে। এ কারণে নতুন মিটারগেজ লোকোমোটিভ কেনার প্রয়োজনীয়তা এখনো রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা মনে করছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে দেশের পরিবহন খাতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। আধুনিক ইঞ্জিনের মাধ্যমে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি যাতায়াত সময় কমবে এবং পরিবহন খরচও হ্রাস পাবে।
বাংলাদেশ যখন শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন একটি শক্তিশালী ও আধুনিক রেল ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুরোনো ইঞ্জিনের পরিবর্তে নতুন প্রযুক্তির লোকোমোটিভ যুক্ত করার এই উদ্যোগ দেশের রেল খাতকে আরও নির্ভরযোগ্য, দক্ষ এবং ভবিষ্যৎ উপযোগী করার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।

