বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রামপালে বড় আকারের একটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। বাগেরহাটের রামপাল এলাকায় ৪৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই পিক সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৯ সাল।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নেওয়া এই প্রকল্প বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো) বাস্তবায়ন করবে। অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রামপালের এই সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হতে পারে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস, কয়লা ও তেলের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য ওঠানামা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত চাপের কারণে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে ঝুঁকছে বিশ্বের অনেক দেশ। বাংলাদেশও সেই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সৌর, বায়ু ও অন্যান্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।
রামপাল সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য উৎসের অংশ বাড়ানো এবং কার্বন নিঃসরণ কমানো। বিশেষ করে সুন্দরবনসংলগ্ন এই অঞ্চলে পরিবেশগত বিষয় বিবেচনায় নিয়ে জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে সৌরবিদ্যুৎকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ হাজার ৫০২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। তবে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) পর্যালোচনায় কিছু খাতে প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয় কমিয়ে চূড়ান্ত ব্যয় ২ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন তহবিল থেকে প্রায় ২ হাজার ১২৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা এবং বিউবোর নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ৩৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পের বিদ্যুৎ উৎপাদন ট্যারিফ নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি ইউনিট ৬ টাকা ১৮ পয়সা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্যান্য অনেক বিদ্যুৎ প্রকল্পের তুলনায় এই উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক প্রতিযোগিতামূলক। তবে ভোক্তারা প্রকৃত সুবিধা পাবেন কি না, তা নির্ভর করবে বিদ্যুৎ কেনার চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণ এবং পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার ওপর।
রামপালে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য আগে থেকেই জমির ব্যবস্থা করা হয়েছে। ২০১২ সালে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বাগেরহাটের রামপালে মোট ১ হাজার ৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করে। এই জমির একটি অংশে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ উদ্যোগের মৈত্রী সুপার থার্মাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। বাকি অংশের একটি বড় অংশ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য ব্যবহার করা হবে।
প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই অনুযায়ী, রামপালের ব্লক-বি এলাকার প্রায় ৬৮৫ একর জমিতে ৪৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা সম্ভব হবে। জমিতে বড় ধরনের অতিরিক্ত উন্নয়ন কাজের প্রয়োজন না থাকায় নির্মাণ ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের জন্য সৌরবিদ্যুৎ একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনাময় খাত। দেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং বছরের অধিকাংশ সময় পর্যাপ্ত সূর্যালোক থাকার কারণে সৌরশক্তি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। তবে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জমি, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা এবং উৎপাদিত বিদ্যুতের কার্যকর ব্যবস্থাপনা।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ চাহিদা আগামী বছরগুলোতে দ্রুত বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইন্টিগ্রেটেড এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, ২০৩০ সালে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা ২৯ হাজার ২৫৭ মেগাওয়াট, ২০৪১ সালে ৫৮ হাজার ৫৯৭ মেগাওয়াট এবং ২০৫০ সালে ৯৬ হাজার ৭৬৭ মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে।
অন্যদিকে, বর্তমানে দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ এখনো সীমিত। এই পরিস্থিতিতে সরকার ২০২৫ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালায় ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
রামপালের মতো বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প এই লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার চাপ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে প্রকল্পটির বাস্তব সুবিধা নিয়ে কিছু প্রশ্নও রয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ, ক্রয় প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং ভোক্তাদের কাছে সুবিধা পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছে, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকার বিভিন্ন সুবিধা দিলেও তার সুফল যেন শুধু বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ কম খরচে উৎপাদিত বিদ্যুৎ যদি ভোক্তার জন্য সাশ্রয়ী না হয়, তাহলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য অনেকাংশে ব্যাহত হতে পারে।
সব মিলিয়ে রামপালের ৪৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন উৎস যোগ করবে, অন্যদিকে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে দেশের দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের পথ আরও শক্তিশালী করবে। তবে প্রকল্পের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং সাধারণ মানুষের জন্য এর বাস্তব সুফল নিশ্চিত করার ওপর।

