১৯৭২ সালে যাত্রা শুরু করা দেশের রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস দীর্ঘদিন ধরে দেশের আকাশপথ যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করে আসছে। বর্তমানে সংস্থাটির বহরে রয়েছে ১৯টি উড়োজাহাজ। তবে বিদ্যমান বহর পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং বাণিজ্যিক সক্ষমতা নিয়ে নানা প্রশ্ন থাকলেও নতুন করে আরও ৩৫টি উড়োজাহাজ যুক্ত করার বড় পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এই পরিকল্পনা অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে ২৫টি এবং ইউরোপের এয়ারবাস থেকে ১০টি উড়োজাহাজ সংগ্রহ করা হবে। দেশের বেসামরিক বিমান পরিবহন খাতে এটি বড় ধরনের বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এত বড় পরিসরের ক্রয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ, বাজার সম্ভাবনা এবং পরিচালন সক্ষমতা যাচাই করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি বিমান সংস্থার বহর বড় করার আগে শুধু উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি বিবেচনা করলেই হয় না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে যাত্রী চাহিদা, নতুন রুট পরিচালনার সম্ভাবনা, পাইলট ও প্রকৌশলীর সংখ্যা, রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা। এসব বিষয় যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করে বড় বহর তৈরি করলে তা ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানের জন্য আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।
জানা গেছে, বিমান কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল লিজ বা ভাড়ার মাধ্যমে ১০টি উড়োজাহাজ যুক্ত করার। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই পরিকল্পনা পরিবর্তন করে একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক নতুন উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশ মনে করছে, এত বড় সিদ্ধান্তের আগে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই করা প্রয়োজন ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, উড়োজাহাজ কেনা একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। একটি নতুন উড়োজাহাজ শুধু কেনার খরচের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জ্বালানি ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ, প্রশিক্ষণ, জনবল এবং পরিচালন ব্যয়ও যুক্ত থাকে। ফলে একটি বিমান সংস্থা লাভজনকভাবে পরিচালিত না হলে নতুন বহর ভবিষ্যতে বড় আর্থিক দায়ে পরিণত হতে পারে।
বিমানের বর্তমান পরিচালন পরিস্থিতি নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। বোয়িংয়ের একটি বিশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বের অন্যান্য গ্রাহকের তুলনায় বিমানের উড়োজাহাজে কারিগরি সমস্যার হার বেশি এবং এসব সমস্যা সমাধানে তুলনামূলকভাবে বেশি সময় ব্যয় হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে এত বড় বহর পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল প্রস্তুত করা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
নতুন উড়োজাহাজ পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক প্রশিক্ষিত পাইলট, প্রকৌশলী এবং কারিগরি কর্মী প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি আধুনিক রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামো তৈরি করাও জরুরি। এসব প্রস্তুতি সময়মতো সম্পন্ন না হলে নতুন উড়োজাহাজগুলো প্রত্যাশিত সুবিধা দিতে নাও পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এই ক্রয় সিদ্ধান্ত কোনো ধরনের বাহ্যিক চাপের কারণে নেওয়া হয়নি। বরং বিমানের ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ, যাত্রীসেবা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যেই এই পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, শুধু ২৫টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনতেই প্রায় ৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৭৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। এর সঙ্গে এয়ারবাসের উড়োজাহাজের মূল্য যুক্ত হলে মোট ক্রয়মূল্য লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এই বিশাল অর্থ একসঙ্গে পরিশোধ করতে হবে না। উড়োজাহাজ সরবরাহ এবং অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া আগামী দশক পর্যন্ত চলবে। প্রথম উড়োজাহাজ হাতে পাওয়ার কথা রয়েছে আগামী দশকের শুরুতে এবং শেষ চালান আসবে তারও পরে। ফলে এর বড় অংশের আর্থিক দায়িত্ব ভবিষ্যৎ সময়ের ওপর বর্তাবে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জন্য এই উদ্যোগ একই সঙ্গে সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বড় বহর দেশের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়াতে, নতুন গন্তব্য চালু করতে এবং যাত্রীসেবা উন্নত করতে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু এর সফলতা নির্ভর করবে সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর ব্যবসায়িক কৌশলের ওপর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু উড়োজাহাজের সংখ্যা বাড়ালেই একটি বিমান সংস্থা শক্তিশালী হয় না। প্রয়োজন হয় সঠিক ব্যবস্থাপনা, দক্ষ জনবল, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত এবং বাজারের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিকল্পনা। তাই নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত করার এই বড় উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ভবিষ্যতে এই সম্পদ কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে তার ওপর।

