বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে কিছুটা গতি ফিরেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল-জুন সময়ে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৬ শতাংশে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শিল্প ও সেবা খাতের উন্নত পারফরম্যান্সের কারণে এই প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
স্থির মূল্যে হিসাব করা এই প্রবৃদ্ধি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৫৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি। অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থবছরের শেষ দিকে রাজনৈতিক পরিবেশ তুলনামূলক শান্ত থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও উৎপাদন কার্যক্রমে কিছুটা স্বাভাবিক গতি ফিরতে শুরু করে, যার প্রভাব জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে দেখা গেছে।
তবে শেষ প্রান্তিকের এই উন্নতি পুরো অর্থবছরের সামগ্রিক চিত্রকে পুরোপুরি বদলাতে পারেনি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চার প্রান্তিক মিলিয়ে দেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ। অর্থাৎ বছরের বেশির ভাগ সময় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দুর্বল থাকায় গড় প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক কম রয়ে গেছে।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে বর্তমান বাজারদরে দেশের জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬ লাখ ১১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। আর স্থির মূল্যে প্রকৃত জিডিপির পরিমাণ ছিল প্রায় ৯ লাখ ২২ হাজার ২০০ কোটি টাকা।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, অর্থনীতির তিনটি বড় খাতের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থান ছিল শিল্প খাতের। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চতুর্থ প্রান্তিকে শিল্প উৎপাদন বেড়েছে ৬ দশমিক ৫২ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ে যেখানে শিল্প প্রবৃদ্ধি ছিল অনেক কম, সেখানে এবার বড় ধরনের উন্নতি দেখা গেছে।
সেবা খাতও অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। দেশের মোট উৎপাদনের বড় অংশজুড়ে থাকা এই খাতে এপ্রিল-জুন সময়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ২৮ শতাংশ। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ খাতে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে ২ দশমিক ০২ শতাংশীয় পয়েন্ট।
তবে কৃষি খাতের চিত্র ছিল ভিন্ন। দেশের কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি এই খাতে চতুর্থ প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধির বদলে সংকোচন হয়েছে ১ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অথচ আগের বছরের একই সময়ে কৃষি খাতে ৩ দশমিক ১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। ফলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে কৃষি খাতের দুর্বলতা একটি বড় বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সর্বশেষ প্রান্তিকের প্রবৃদ্ধি দেখাচ্ছে যে শিল্প ও সেবা খাতের ওপর ভর করে অর্থনীতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য কৃষি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং উৎপাদন সক্ষমতা—সব ক্ষেত্রেই সমান উন্নতি প্রয়োজন।
অর্থবছরের শেষ দিকে প্রবৃদ্ধির এই গতি অর্থনীতিতে ইতিবাচক সংকেত দিলেও সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের ধীরগতি এবং উৎপাদন ব্যয়ের চাপ কাটিয়ে অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির পথে নিতে হলে কাঠামোগত সংস্কার ও কার্যকর নীতি সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

